বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসির প্রস্তাবিত নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনে অনাপত্তি দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আদালতের মৌখিক নির্দেশনা, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ৯ সদস্যের নতুন পর্ষদ গঠনে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানির মামলা প্রত্যাহারের শর্তে কমিশনের আগে জারি করা দুটি আদেশ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তও হয়েছে।
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে কমিশনের ১ হাজার ৩১তম সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
৯ সদস্যের পর্ষদে থাকছেন যারা
বিএসইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বেক্সিমকো ফার্মার প্রস্তাবিত ৯ সদস্যের পর্ষদে তিনজন স্পনসর পরিচালক থাকবেন। তারা হলেন এএসএফ রহমান, ওসমান কায়সার চৌধুরী ও ইকবাল আহমেদ।
এ ছাড়া একজন নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসির একজন পরিচালক পর্ষদে থাকবেন।
পর্ষদের বাকি চারজন হবেন স্বতন্ত্র পরিচালক। তাদের মধ্যে তিনজনকে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হবে এবং চার স্বতন্ত্র পরিচালকের একজন নারী হবেন। এসব নিয়োগ করপোরেট সুশাসন বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী করার কথা জানিয়েছে কমিশন।
অর্থাৎ প্রস্তাবিত পর্ষদে তিনজন স্পনসর পরিচালক, একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক, একজন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক—সব মিলিয়ে সদস্য থাকবেন ৯ জন।
পুরো পর্ষদের নাম প্রকাশ হয়নি
পর্ষদের কাঠামো জানানো হলেও সব সদস্যের নাম প্রকাশ করা হয়নি। বিশেষ করে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নাম, আইএফআইসি ব্যাংকের মনোনীত পরিচালকের নাম এবং চার স্বতন্ত্র পরিচালকের কারও নাম বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ নেই।
ফলে নতুন পর্ষদে কোন শ্রেণির কতজন পরিচালক থাকবেন, তা স্পষ্ট হলেও পুরো পর্ষদের সদস্যদের পরিচয় এখনো প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে না।
মামলা প্রত্যাহারের শর্তে আগের দুই আদেশ বাতিল
বেক্সিমকো ফার্মাকে ঘিরে বিএসইসির সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আগের দুটি আদেশ প্রত্যাহার।
কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোম্পানি মামলা প্রত্যাহার করলে আগের দুটি আদেশ প্রত্যাহার করা হবে। এর মধ্যে একটি আদেশ জারি হয়েছিল ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ এবং অপরটি ১৫ জানুয়ারি ২০২৬।
৩১ ডিসেম্বর ২০২৪-এর আদেশের নম্বর বিএসইসি/আইসিএ/সিজি/২০২৩/৬৬/পার্ট-১/৪৯৬ এবং ১৫ জানুয়ারি ২০২৬-এর আদেশের নম্বর বিএসইসি/আইসিএ/সিজি/২০২৩/৬৬/পার্ট-১/৩০।
অর্থাৎ নতুন পর্ষদ গঠনে অনাপত্তি এবং পুরোনো দুটি আদেশ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
কমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে সূত্র নম্বর নিয়ে প্রশ্ন
বিএসইসির প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি অসঙ্গতি চোখে পড়ে।
প্রথমত, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুষ্ঠিত ১ হাজার ৩১তম কমিশন সভার সিদ্ধান্ত জানানো হলেও বিজ্ঞপ্তির সূত্র নম্বরে ‘বিএসইসি/মুখপাত্র/০২/২০২৪/২৬৫’ উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের সিদ্ধান্তসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে সূত্র নম্বরে ২০২৪ সালের উল্লেখ রয়েছে।
কেন ২০২৬ সালের সভার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের সূত্র নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিতে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
বন্ডের মোট অঙ্কেও ৪০০ কোটি টাকার পার্থক্য
বিএসইসির সভার সিদ্ধান্তে ব্যাংকগুলোর বন্ড অনুমোদনের অঙ্কেও উল্লেখযোগ্য অসঙ্গতি রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তির এক জায়গায় চার ব্যাংকের মোট ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার বন্ড অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে। অথচ একই বিজ্ঞপ্তিতে পাঁচটি ব্যাংকের বন্ডের পৃথক অঙ্ক দেওয়া হয়েছে।
পৃথকভাবে উল্লেখ করা অঙ্কগুলো হলো—
- ওয়ান ব্যাংক: ৪০০ কোটি টাকা
- সাউথইস্ট ব্যাংক: ৮০০ কোটি টাকা
- ব্র্যাক ব্যাংক: ১ হাজার কোটি টাকা
- আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক: ৫০০ কোটি টাকা
- ব্যাংক এশিয়া: ৮০০ কোটি টাকা
এই পাঁচটি অঙ্ক যোগ করলে মোট দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ফলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা এবং পৃথক বন্ডগুলোর হিসাবের মধ্যে ৪০০ কোটি টাকার পার্থক্য রয়েছে।
এটি বিজ্ঞপ্তির তথ্য উপস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি, যার বিষয়ে কমিশনের ব্যাখ্যা প্রয়োজন হতে পারে।
বন্ডের অর্থ ব্যবহারে ভিন্নতা
পাঁচ ব্যাংকের বন্ডের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে।
ওয়ান ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের বন্ডের অর্থ বাসেল-৩ কাঠামোর আওতায় দ্বিতীয় স্তরের মূলধন শক্তিশালী করতে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে ব্র্যাক ব্যাংকের ১ হাজার কোটি টাকার বন্ডটি ৩ বছর মেয়াদি সবুজ বন্ড। এর অর্থ যোগ্য গ্রাহকদের কম খরচে সবুজ অর্থায়নে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
ব্যাংক এশিয়ার বন্ডের অর্থ দ্বিতীয় স্তরের মূলধন শক্তিশালী করার পাশাপাশি যোগ্য সবুজ ও টেকসই প্রকল্পে অর্থায়ন ও পুনঃঅর্থায়নে ব্যবহারের কথা রয়েছে।
মেয়াদ ও অভিহিত মূল্যেও পার্থক্য
বন্ডগুলোর মেয়াদ এবং অভিহিত মূল্য এক নয়।
ওয়ান ব্যাংকের প্রতিটি বন্ডের অভিহিত মূল্য ১ লাখ টাকা। সাউথইস্ট ব্যাংক ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের প্রতিটি বন্ডের অভিহিত মূল্য ৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে ব্র্যাক ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়ার প্রতিটি বন্ডের অভিহিত মূল্য ১০ লাখ টাকা।
মেয়াদের ক্ষেত্রে ব্র্যাক ব্যাংকের বন্ড ৩ বছর মেয়াদি। সাউথইস্ট ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়ার বন্ডের মেয়াদ ৭ বছর। ওয়ান ব্যাংকের বন্ডটি ষষ্ঠ পর্বের অধীনস্থ বন্ড হিসেবে অনুমোদিত হয়েছে।
সুদহার কাঠামোতেও রয়েছে পার্থক্য
ওয়ান ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়ার বন্ডে প্রযোজ্য রেফারেন্স হারের সঙ্গে ৩ শতাংশ যোগ করে পরিবর্তনশীল সুদহার নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
তবে ব্র্যাক ব্যাংকের বন্ডটি এ কাঠামো থেকে আলাদা। এটি ৩ বছর মেয়াদি শূন্য-কুপন সবুজ বন্ড এবং এর সম্ভাব্য ছাড়ের হার ৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
ট্রাস্টি ও ইস্যু ব্যবস্থাপক
বন্ডগুলোর ট্রাস্টি ও ইস্যু ব্যবস্থাপকের তথ্যও বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া হয়েছে।
ওয়ান ব্যাংকের বন্ডের ট্রাস্টি গ্রিন ডেল্টা ক্যাপিটাল লিমিটেড এবং ইস্যু ব্যবস্থাপক ইউসিবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
সাউথইস্ট ব্যাংক ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের বন্ডের ট্রাস্টি ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসি এবং ইস্যু ব্যবস্থাপক ইউসিবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
ব্র্যাক ব্যাংকের বন্ডের ট্রাস্টি প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট পিএলসি এবং ইস্যু ব্যবস্থাপক আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড।
ব্যাংক এশিয়ার বন্ডের ট্রাস্টি ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসি এবং ইস্যু ব্যবস্থাপক প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট পিএলসি।
মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা
অনুমোদিত বন্ডগুলো নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত করার বিষয়টিও কমিশনের সিদ্ধান্তে উল্লেখ রয়েছে।
সব মিলিয়ে ২৯ সেপ্টেম্বরের কমিশন সভায় বেক্সিমকো ফার্মার ৯ সদস্যের প্রস্তাবিত পর্ষদ গঠনে অনাপত্তি এবং মামলা প্রত্যাহারের শর্তে আগের দুটি আদেশ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সভায় পাঁচ ব্যাংকের বন্ড অনুমোদনের সিদ্ধান্তও এসেছে।
তবে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে ৩ হাজার ১০০ কোটি ও ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার পার্থক্য, ২০২৬ সালের সভার বিজ্ঞপ্তিতে সূত্র নম্বরে ২০২৪ সালের উল্লেখ এবং বেক্সিমকো ফার্মার প্রস্তাবিত পর্ষদের কয়েকজন সদস্যের নাম প্রকাশ না করার মতো বিষয় রয়েছে। এসব বিষয়ে কমিশনের অতিরিক্ত ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে সিদ্ধান্তগুলোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
























