ইসলামি ধারার ব্যাংকের ‘ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড’ পরিচালনায় পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নীতিমালায় কার্ডের ব্যবহার, ব্যাংকের মাশুল আদায়, গ্রাহক সুরক্ষা এবং শরিয়াহসম্মত লেনদেন নিশ্চিত করতে বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় অ্যালকোহল, জুয়া, নাইটক্লাবসহ নির্দিষ্ট কিছু খাতে ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি বিভাগ থেকে গতকাল সোমবার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন দেশের সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো হয়। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের সম্প্রসারণ, ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহক অধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যেই এ নীতিমালা করা হয়েছে।
যেসব খাতে কার্ড ব্যবহার করা যাবে না
নির্দেশনা অনুযায়ী, ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড দিয়ে শরিয়াহবিরোধী বা বেআইনি কোনো পণ্য ও সেবা কেনা যাবে না। এ জন্য ব্যাংকগুলোকে তাদের সিস্টেমে সংশ্লিষ্ট ‘মার্চেন্ট ক্যাটাগরি কোড’ ব্লক করে রাখতে হবে।
এর আওতায় অ্যালকোহল, জুয়া, নাইটক্লাব, প্রচলিত বিমা কোম্পানি, অবৈধ ডেটিং বা ম্যাচমেকিং এবং শূকরের মাংসসংক্রান্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা যাবে না।
কোনো গ্রাহক নিষিদ্ধ বা বেআইনি লেনদেন করলে ব্যাংককে তাৎক্ষণিকভাবে কার্ড বাতিল করতে হবে এবং বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে।
ব্যাংক যেসব মাশুল নিতে পারবে
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, কার্ড ইস্যু, নবায়ন, প্রতিস্থাপন, নেটওয়ার্ক সুবিধা এবং হিসাব রক্ষণাবেক্ষণের মতো নির্দিষ্ট সেবার বিপরীতে ব্যাংক ‘উজরহ’ বা সেবামূল্য নিতে পারবে।
তবে এই মাশুল গ্রাহকের বকেয়া স্থিতি, ঋণের সীমা বা বিল পরিশোধে বিলম্বের ওপর ভিত্তি করে বাড়ানো বা কমানো যাবে না।
গ্রাহক নির্ধারিত সময়ে বিল পরিশোধে ব্যর্থ হলেও ব্যাংক কোনো বিলম্ব জরিমানা নিজেদের আয় হিসেবে নিতে পারবে না।
বিলম্বের অর্থ যাবে দাতব্য খাতে
বিল পরিশোধে বিলম্বের ক্ষেত্রে গ্রাহককে চুক্তির সময় নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এ ব্যবস্থাকে ‘ইলতিজাম বি আত-তাবাররু’ বলা হয়েছে।
এই অর্থ ব্যাংকের মূল আয়ের বাইরে পৃথক একটি দাতব্য হিসাবে সংরক্ষণ করতে হবে। পরে শরিয়াহ কমিটির তত্ত্বাবধানে অর্থটি দাতব্য কাজে ব্যয় করতে হবে।
গ্রাহকের নিরাপত্তায় নতুন নির্দেশনা
ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড চালুর আগে গ্রাহকের ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ডভিত্তিক সম্মতি নিতে হবে। একই সঙ্গে কার্ড-সংক্রান্ত তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কার্ড হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে তা ব্লক করার অনুরোধ পাওয়ার পর সাত কার্যদিবসের মধ্যে অননুমোদিত লেনদেনের অর্থ ফেরত দিতে হবে। পাশাপাশি ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডে ‘টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সুদ নয়, কর্জ হাসান ও উজরহ ভিত্তি
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের মূল ভিত্তি হবে ‘কর্জ হাসান’ বা সুদমুক্ত ঋণ এবং ‘উজরহ’ বা সেবামূল্য।
প্রচলিত ক্রেডিট কার্ডের মতো গ্রাহকের ঋণকে ব্যাংকের আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। একই সঙ্গে গ্রাহক যাতে তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত ব্যয় না করেন, তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে।
কারা ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড দিতে পারবে
বাংলাদেশ ব্যাংকে নিবন্ধিত যেকোনো ইসলামি ব্যাংক ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করতে পারবে। পাশাপাশি সাধারণ ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো বা ইসলামিক শাখার মাধ্যমেও এ কার্ড দেওয়া যাবে।
তবে বৈদেশিক মুদ্রা বা দ্বৈত মুদ্রার ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে অনুমোদিত ডিলার হতে হবে।
বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড সেবা দিচ্ছে। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে এসব কার্ডের ব্যবহার ও পরিচালনায় একটি অভিন্ন কাঠামো নির্ধারণ করল বাংলাদেশ ব্যাংক।
























