সামষ্টিক অর্থনীতির চাপের পাশাপাশি কোম্পানিটির মুনাফায় সাম্প্রতিক পতন—এই দুইয়ের প্রভাবে দেশের শেয়ারবাজারে বহুজাতিক কোম্পানি মারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের শেয়ার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট—টানা ছয় মাসে কোম্পানিটির প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার শেয়ার বিক্রি করেছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। বর্তমান বাজারমূল্য হিসাবে এসব শেয়ারের দাম প্রায় ৮৫ কোটি টাকা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্চ শেষে মারিকো বাংলাদেশের মোট শেয়ারের ১ দশমিক ৯১ শতাংশ ছিল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে। ছয় মাস পর আগস্ট শেষে সেই মালিকানা নেমে এসেছে মাত্র শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশে। অর্থাৎ এই সময়ে বিদেশি মালিকানা কমেছে ১ শতাংশ পয়েন্ট।
মাসভিত্তিক তথ্যেও বিদেশিদের ধারাবাহিক বিক্রির চিত্র স্পষ্ট। মার্চে বিদেশি মালিকানা ১ দশমিক ৯১ শতাংশ থাকলেও এপ্রিলে তা কমে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে দাঁড়ায়। মে মাসে আরও কমে হয় ১ দশমিক ৮০ শতাংশ। জুনে নেমে আসে ১ দশমিক ৫৩ শতাংশে। জুলাইয়ে বিদেশি মালিকানা আরও কমে শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং সর্বশেষ আগস্টে তা দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশে।
অর্থাৎ শুধু এক মাসে নয়, মার্চের পর প্রতিটি মাসেই মারিকোর শেয়ারে বিদেশি অংশীদারত্ব কমেছে।
বিদেশি বিনিয়োগ কমানোর তালিকায় রয়েছে নরওয়ের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলও। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই তহবিলের হাতে থাকা মারিকো বাংলাদেশের শেয়ারের পরিমাণ ২০২৫ সালে মোট শেয়ারের ০ দশমিক ৬৭ শতাংশ ছিল। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে তা কমে দাঁড়িয়েছে ০ দশমিক ৫২ শতাংশে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় দেশের তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে মারিকো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামষ্টিক অর্থনীতির নানা চাপ তাদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে কোম্পানিটির সাম্প্রতিক মুনাফা কমার বিষয়টিও বিনিয়োগকারীদের নজরে এসেছে।
তবে বিদেশি মালিকানা কমলেও তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগের দিক থেকে এখনও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে মারিকো বাংলাদেশ। এ তালিকায় কোম্পানিটির ওপরে রয়েছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ এবং বাটা শু কোম্পানি (বাংলাদেশ)।
আগস্ট শেষে মারিকো বাংলাদেশের মোট শেয়ারের ৯০ শতাংশ রয়েছে স্পনসর ও পরিচালকদের হাতে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ শেয়ার।
মুনাফায় চার বছরের মধ্যে প্রথম পতন
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির ধারাবাহিকতার মধ্যেই কোম্পানিটির মুনাফায়ও পতন দেখা দিয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে মারিকো বাংলাদেশের কর-পরবর্তী নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৩৮ শতাংশ কমে ১৭০ কোটি ৪৭ লাখ টাকায় নেমে এসেছে।
চার বছরের মধ্যে এই প্রথম কোনো প্রান্তিকে কোম্পানিটির মুনাফা কমেছে। অর্থাৎ ব্যবসার আয় বাড়লেও সেই হারে মুনাফা ধরে রাখতে পারেনি কোম্পানিটি।
এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে মারিকোর রাজস্ব অবশ্য ৪ শতাংশ বেড়ে ৫৩১ কোটি ৮৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং আর্থিক আয় কমে যাওয়ায় রাজস্ব বৃদ্ধির সুফল পুরোপুরি মুনাফায় প্রতিফলিত হয়নি বলে জানিয়েছে কোম্পানি।
এর প্রভাব পড়েছে শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএসেও। গত বছরের একই সময়ে যেখানে কোম্পানিটির ইপিএস ছিল ৬১ টাকা ৭৭ পয়সা, সেখানে চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৪ টাকা ১২ পয়সায়।
শুধু মুনাফা নয়, পরিচালন কার্যক্রম থেকেও নগদ প্রবাহে চাপ দেখা গেছে। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ ৬৬ টাকা ৭৩ পয়সা থেকে কমে ২০ টাকা ২৮ পয়সায় নেমেছে। সরবরাহকারীদের অর্থ পরিশোধ বেড়ে যাওয়ায় নগদ প্রবাহে এই চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানি।
তবে কোম্পানির সম্পদমূল্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। ৩০ জুন ২০২৬ শেষে মারিকো বাংলাদেশের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বা এনএভি বেড়ে হয়েছে ১৪৬ টাকা ১৪ পয়সা। মার্চ শেষে এই মূল্য ছিল ৯২ টাকা ২ পয়সা।
মুনাফা কমলেও ৫০০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড
মুনাফা কমার মধ্যেও শেয়ারহোল্ডারদের জন্য বড় অঙ্কের অন্তর্বর্তী নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে মারিকো বাংলাদেশ। কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ৫০০ শতাংশ অন্তর্বর্তী ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে শেয়ারহোল্ডাররা পাবেন ৫০ টাকা নগদ লভ্যাংশ।
কোম্পানিটির ভারতীয় মূল কোম্পানি মারিকো লিমিটেডে মুনাফা পাঠানোর ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেও এই উচ্চ লভ্যাংশকে দেখা হচ্ছে।
ফলে একদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ধারাবাহিক শেয়ার বিক্রি এবং মুনাফায় পতন যেমন কোম্পানিটির প্রতি বাজারের নজর কেড়েছে, অন্যদিকে উচ্চ অঙ্কের নগদ লভ্যাংশ ও সম্পদমূল্য বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
























