দেশের ব্যাংকিং খাতে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কয়েকটি শীর্ষ ব্যাংকের আর্থিক সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। একদিকে যেখানে মুনাফা ও শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে, অন্যদিকে আমানত সংগ্রহ, বিনিয়োগ থেকে আয় এবং খেলাপি ঋণ আদায়েও ইতিবাচক ফল পেয়েছে ব্যাংকগুলো। প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক (ইবিএল) এবং সিটি ব্যাংক ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে নিজ নিজ কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি জানিয়েছে, ‘স্পেশাল ডিপোজিট অ্যান্ড রিকভারি ক্যাম্পেইন-২০২৬’-এর আওতায় গত ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত মাত্র ৬০ কার্যদিবসে ৩ হাজার ৩ কোটি টাকার নতুন আমানত সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সময়ে, অর্থাৎ বছরের প্রথম ছয় মাসে খেলাপি ঋণ থেকে প্রায় ৭৬৯ কোটি টাকা নগদ আদায় করতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকটি।
ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আরিফুর রহমান বলেন, এই অর্জন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং গ্রাহকদের আস্থার প্রতিফলন। তিনি দায়িত্বশীল ব্যাংকিং চর্চা ও মানসম্মত গ্রাহকসেবা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনজুর মফিজ ভবিষ্যতের আমানত সংগ্রহ কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। ব্যাংকটির ভাষ্য, গ্রাহককেন্দ্রিক সেবা, নতুন উদ্যোগ এবং কর্মীদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (ইবিএল) ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে সমন্বিতভাবে ৪৩৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদিত অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রথমার্ধে ব্যাংকটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) বেড়ে ২ টাকা ৬৭ পয়সা হয়েছে, যেখানে এক বছর আগে তা ছিল ২ টাকা ১৪ পয়সা। একক ভিত্তিতেও ইপিএস ২ টাকা ৩৫ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৬১ পয়সায় পৌঁছেছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে সমন্বিত ইপিএস ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১ টাকা ৪৬ পয়সা হয়েছে।
ইবিএল জানিয়েছে, সরকারি ট্রেজারি বন্ডে অধিক বিনিয়োগ, নন-ফান্ডেড আয়ের সম্প্রসারণ এবং পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধির ফলে মুনাফায় এই উন্নতি সম্ভব হয়েছে। তবে একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ১৩ টাকা ১০ পয়সা থেকে কমে ৭ টাকা ৫৭ পয়সায় নেমে এসেছে। অন্যদিকে ৩০ জুন পর্যন্ত সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) বেড়ে ৩০ টাকা ৭১ পয়সায় দাঁড়িয়েছে, যা এক বছর আগে ছিল ২৭ টাকা ৭ পয়সা। একক ভিত্তিতে এনএভি হয়েছে ৩১ টাকা ১২ পয়সা। ব্যাংকটি দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খেলাপি ঋণের হারও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল ব্যাংকিং, ট্রেড ফাইন্যান্স, কার্ড ব্যবসা এবং ফি-ভিত্তিক আয় ভবিষ্যতেও ব্যাংকটির মুনাফা ধরে রাখতে সহায়ক হবে।
এদিকে, সিটি ব্যাংকও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে শক্তিশালী আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করেছে। এ সময়ে ব্যাংকটির সমন্বিত নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৫২৬ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মতে, বিনিয়োগ থেকে উচ্চ আয় এবং কমিশন ও ফি-ভিত্তিক আয়ের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধিই এই সাফল্যের প্রধান চালিকা শক্তি।
প্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-জুন সময়ে সমন্বিত ইপিএস ১ টাকা ৭২ পয়সা থেকে বেড়ে ৩ টাকা ১ পয়সা হয়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় ১ টাকা ১৯ পয়সা থেকে উন্নীত হয়ে ১ টাকা ৬৩ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য ৩৫ টাকা ৩৭ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৭ টাকা ৬০ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। আর শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি দেখা গেছে, যা ১৩ টাকা ৯৪ পয়সা থেকে বেড়ে ৪৪ টাকা ২০ পয়সায় পৌঁছেছে।
সামগ্রিকভাবে প্রকাশিত অর্ধবার্ষিক আর্থিক ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, দেশের কয়েকটি শীর্ষ ব্যাংক মুনাফা বৃদ্ধি, সম্পদের মানোন্নয়ন, আমানত সংগ্রহ এবং আয় উৎসের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে তাদের আর্থিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছে।
























