ঢাকা   সোমবার ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

‘পিবি রেশিও’ নিয়ে উদ্বেগের প্রয়োজন নেই, বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:১১, ২৭ জুলাই ২০২৬

‘পিবি রেশিও’ নিয়ে উদ্বেগের প্রয়োজন নেই, বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান

সম্প্রতি মার্জিন ঋণসংক্রান্ত বিধিমালায় পরিবর্তনের প্রস্তাব প্রকাশের পর শেয়ারবাজারে ‘পিবি রেশিও’ বা প্রাইস টু বুক ভ্যালু নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিমা খাতের কোম্পানিগুলো মার্জিন ঋণের সুবিধা হারাতে পারে—এমন আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ায় এই খাতের বেশিরভাগ শেয়ারের দাম কমে যায়। তবে বিনিয়োগকারীদের অযথা উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান।

ঢাকা পোস্টকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বর্তমানে যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটি এখনো একটি খসড়া প্রস্তাব। এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। তাই খসড়া দেখে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

তার ভাষায়, নতুন কোনো নিয়ম সামনে এলে শুরুতে অনেকেই সেটি পুরোপুরি বুঝতে পারেন না। দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীরা পিই (Price to Earnings) রেশিও ব্যবহার করে আসায় এটি সবার কাছে পরিচিত। কিন্তু পিবি (Price to Book Value) রেশিও নতুন হওয়ায় অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুঁজিবাজারে এই সূচকও বহুল ব্যবহৃত একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড।

তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। আলোচনা শেষে যে বিধিমালা চূড়ান্ত হবে, সেখানে প্রয়োজন হলে পরিবর্তন আনা হবে। অর্থাৎ বর্তমান খসড়াই শেষ সিদ্ধান্ত—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

সহজভাবে ‘পিবি রেশিও’ কী?

ধরুন, একটি কোম্পানির সব সম্পদ বিক্রি করে সব ঋণ পরিশোধ করার পর শেয়ারপ্রতি প্রকৃত সম্পদের মূল্য দাঁড়ায় ১০০ টাকা। এটিই বইমূল্য বা বুক ভ্যালু।

এখন যদি বাজারে সেই শেয়ার ১০০ টাকায় বিক্রি হয়, তাহলে পিবি রেশিও হবে ১।

যদি একই শেয়ার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়, তাহলে পিবি রেশিও হবে ২।

আর যদি ৩০০ টাকায় লেনদেন হয়, তাহলে পিবি রেশিও হবে ৩।

অর্থাৎ বাজারদর বইমূল্যের কত গুণ, সেটিই পিবি রেশিও দিয়ে বোঝানো হয়।

খসড়া প্রস্তাবে কী বলা হয়েছে?

মার্জিন বিধিমালার খসড়া সংশোধনীতে বিএসইসি প্রস্তাব করেছে, ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আগের পিই রেশিওর পরিবর্তে পিবি রেশিও বিবেচনা করা হবে।

এখানে প্রস্তাব অনুযায়ী—

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পিবি রেশিও ৩-এর বেশি হলে ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে মার্জিন ঋণ দেওয়া যাবে না।
অন্যদিকে বিমা কোম্পানির পিবি রেশিও ১-এর বেশি হলে সেই শেয়ারে মার্জিন সুবিধা দেওয়া হবে না।

এই দুই খাতের জন্য ভিন্ন সীমা নির্ধারণ করায় বাজারে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সহজভাবে বললে, যদি কোনো বিমা কোম্পানির বইমূল্য ১০০ টাকা হয় এবং বাজারে তার শেয়ার ১১০ টাকায় লেনদেন হয়, তাহলে পিবি রেশিও হবে ১.১। খসড়া অনুযায়ী তখন সেই শেয়ার মার্জিন ঋণের আওতার বাইরে চলে যেতে পারে। কিন্তু একই পরিস্থিতিতে কোনো ব্যাংকের শেয়ার ২৮০ বা ৩০০ টাকা পর্যন্ত থাকলেও নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকায় মার্জিন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকবে।

এই কারণেই অনেক বিনিয়োগকারী মনে করছেন, বিমা খাত তুলনামূলক বেশি চাপে পড়তে পারে।

বাজার বিশ্লেষকদের হিসাবে, এই প্রস্তাব কার্যকর হলে দেশের তালিকাভুক্ত ৫৮টি বিমা কোম্পানির মধ্যে মাত্র ৭ থেকে ৮টি প্রতিষ্ঠান মার্জিন ঋণের জন্য যোগ্য হতে পারে। ফলে ৫০টিরও বেশি কোম্পানি এই সুবিধার বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সীমা তুলনামূলক বেশি থাকায় সেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ অধিকাংশ ব্যাংকের শেয়ারদর এখনো তাদের নিট সম্পদমূল্যের কাছাকাছি অবস্থান করছে। ফলে অন্যান্য শর্ত পূরণ হলে তারা সহজেই মার্জিন সুবিধা পেতে পারে।

বাজারে কী প্রভাব পড়েছে?

গত ১৪ জুলাই বিএসইসির ১০২০তম কমিশন সভায় মার্জিন বিধিমালার এই খসড়া অনুমোদনের পর থেকেই শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রস্তাব প্রকাশের পর থেকেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে কিছুদিন আগেও ঊর্ধ্বমুখী থাকা বাজার আবার দুর্বল হয়ে পড়ে।

গত সপ্তাহে (১৯ থেকে ২৩ জুলাই) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৯৬ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৮০৪ পয়েন্টে নেমে আসে। এই পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল বিমা খাতের শেয়ারগুলোর। সপ্তাহজুড়ে তালিকাভুক্ত ৫৮টি বিমা কোম্পানির মধ্যে ৫৪টির শেয়ারদর কমেছে। বিপরীতে দাম বেড়েছে মাত্র ৪টির।

ফলে শুধু বিমা খাত নয়, পুরো শেয়ারবাজারের ইতিবাচক গতি অনেকটাই থমকে যায়।

প্রয়োজন হলে পরিবর্তন আনা হবে

বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, যদি দেখা যায় বাজারে কোনো প্রস্তাব ভুলভাবে বোঝা হচ্ছে অথবা সেটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অযাচিত নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করছে, তাহলে কমিশন অবশ্যই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে।

তার মতে, কোনো নিয়মের উদ্দেশ্য যদি বাজারকে শক্তিশালী করা হয়, কিন্তু বাস্তবে সেটি উল্টো আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তাহলে সেই বিষয়টি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান কমিশন সবসময় বাজারবান্ধব নীতিতে বিশ্বাস করে। তাই বিনিয়োগকারীদের মতামত উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হবে না। শুধু ‘পিবি রেশিও’ নয়, খসড়া বিধিমালার অন্য কোনো বিষয়ে যদি যৌক্তিক আপত্তি আসে, সেগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে। সূত্র: ঢাকা পোস্ট