ঢাকা   শুক্রবার ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩

গ্রামীণফোনের শেয়ার: উচ্চ লভ্যাংশের হাতছানি, নাকি লুকিয়ে আছে ঝুঁকি?

শেয়ারবাজার

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১১:৩৪, ৩ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ১১:৩৮, ৩ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ

গ্রামীণফোনের শেয়ার: উচ্চ লভ্যাংশের হাতছানি, নাকি লুকিয়ে আছে ঝুঁকি?

দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে ডিভিডেন্ডভিত্তিক (Dividend Yield) বিনিয়োগকারীদের অন্যতম পছন্দের শেয়ার গ্রামীণফোন লিমিটেড (জিপি)। নিয়মিত উচ্চ হারে নগদ লভ্যাংশ, শক্তিশালী নগদ প্রবাহ, সর্বোচ্চ ক্রেডিট রেটিং এবং টেলিযোগাযোগ খাতে বাজার নেতৃত্ব—এসব কারণে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করেন অনেক বিনিয়োগকারী। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মুনাফা কমে যাওয়া, নেট অ্যাসেট ভ্যালু (NAV) হ্রাস, বড় অঙ্কের স্পেকট্রাম বিনিয়োগ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে শেয়ারটিতে কিছু ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

কেন গ্রামীণফোনের শেয়ার ভালো?

১. ধারাবাহিক উচ্চ নগদ লভ্যাংশ

গ্রামীণফোনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নিয়মিত উচ্চ হারে ক্যাশ ডিভিডেন্ড প্রদান। ২০২৫ সালের জন্য কোম্পানিটি মোট ২১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে ৩৩০ শতাংশ, ২০২২ সালে ২২০ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ২৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদান করে। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের উচ্চ নগদ রিটার্ন দিয়ে আসছে।

২০২৫ সালে ডিভিডেন্ড ইয়িল্ড ছিল প্রায় ৮.৩৪ শতাংশ, যা দেশের অধিকাংশ তালিকাভুক্ত কোম্পানির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

২. তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় মূল্যায়ন (P/E Ratio)

বর্তমানে গ্রামীণফোনের ট্রেইলিং পিই অনুপাত প্রায় ১১.৭ গুণ এবং সর্বশেষ আর্থিক তথ্য অনুযায়ী বর্তমান পিই প্রায় ১৩ গুণের কাছাকাছি। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্থিতিশীল নগদ প্রবাহ ও শক্তিশালী ব্যবসায়িক ভিত্তির একটি কোম্পানির জন্য এ মূল্যায়ন অতিরিক্ত ব্যয়বহুল নয়।

৩. শক্তিশালী বাজার অবস্থান

বাংলাদেশের মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতে গ্রামীণফোন এখনও বাজারের শীর্ষ অপারেটর। বিশাল গ্রাহকভিত্তি, শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং ব্র্যান্ড ভ্যালু কোম্পানিটির দীর্ঘমেয়াদি আয়ের সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করছে।

৪. শক্তিশালী নগদ প্রবাহ ও ক্রেডিট রেটিং

২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ (NOCFPS) ছিল শেয়ারপ্রতি ১২.৪৮ টাকা। এছাড়া ক্রেডিট রেটিং সংস্থা সিআরআইএসএল কোম্পানিটিকে দীর্ঘমেয়াদে AAA এবং স্বল্পমেয়াদে ST-1 রেটিং দিয়েছে, যা কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতার প্রতি আস্থা প্রকাশ করে।

৫. বড় উদ্যোক্তা অংশীদারিত্ব

কোম্পানির প্রায় ৯০ শতাংশ শেয়ার উদ্যোক্তা বা স্পন্সরদের হাতে রয়েছে। ফলে ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বাস্তবায়নের সুযোগ বেশি।

কোথায় রয়েছে ঝুঁকি?

১. মুনাফা কমেছে

২০২৪ সালে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (EPS) ছিল ২৬.৮৯ টাকা, যা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২১.৯০ টাকায়। একই সঙ্গে বার্ষিক নিট মুনাফাও প্রায় ৩৬ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা থেকে কমে প্রায় ২৯ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এটি কোম্পানির আয় প্রবৃদ্ধিতে চাপের ইঙ্গিত দেয়।

২. নেট অ্যাসেট ভ্যালু (NAV) কমছে

২০২৪ সালে শেয়ারপ্রতি নেট সম্পদ মূল্য ছিল ৪৭.৯৫ টাকা, যা ২০২৫ সালে কমে ৪১.৪৯ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আবার ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে NAV আরও কমে ৪৬.৩৯ টাকা হয়েছে। উচ্চ ডিভিডেন্ড বিতরণ এবং মুনাফা কমে যাওয়াই এর অন্যতম কারণ।

৩. বড় অঙ্কের স্পেকট্রাম ব্যয়

২০২৬ সালে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম অর্জনের জন্য প্রায় ২,১৭০ কোটি টাকা (ভ্যাটসহ) ব্যয়ের দায় নিয়েছে কোম্পানি। যদিও এটি দীর্ঘমেয়াদে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে সহায়ক হবে, তবে আগামী কয়েক বছর নগদ প্রবাহের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

৪. রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে চাপের আশঙ্কা

চলতি বছরের শুরুতে কোম্পানি নিজেই জানিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্বল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশের কারণে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব প্রায় ২ শতাংশ এবং EBITDA প্রায় ৩ শতাংশ কমতে পারে। যদিও পরবর্তীতে প্রথম প্রান্তিকে EPS কিছুটা বেড়েছে, তবুও সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশ এখনও চ্যালেঞ্জপূর্ণ।

৫. তারল্য তুলনামূলক কম

গ্রামীণফোনের মোট বাজার মূলধন প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হলেও ফ্রি-ফ্লোট মাত্র প্রায় ১০ শতাংশেরও কম। ফলে বাজারে লেনদেনযোগ্য শেয়ারের পরিমাণ সীমিত, যা বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য কখনো কখনো তারল্য সংকট তৈরি করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মত

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গ্রামীণফোন মূলত ডিভিডেন্ডভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য উপযুক্ত শেয়ার। যাঁরা নিয়মিত নগদ আয় এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল ব্যবসা খোঁজেন, তাঁদের কাছে এটি এখনও আকর্ষণীয়।

তবে স্বল্পমেয়াদে দ্রুত মূলধনী মুনাফা (Capital Gain) প্রত্যাশীদের জন্য শেয়ারটির সম্ভাবনা তুলনামূলক সীমিত হতে পারে। কারণ কোম্পানির মুনাফা প্রবৃদ্ধি বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে এবং বড় বিনিয়োগ ব্যয় ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আগামী কয়েক প্রান্তিকে ব্যবসার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

গ্রামীণফোনের শেয়ার একদিকে উচ্চ নগদ লভ্যাংশ, শক্তিশালী ব্যবসায়িক ভিত্তি ও সর্বোচ্চ ক্রেডিট রেটিংয়ের কারণে নিরাপদ বিনিয়োগের একটি উদাহরণ। অন্যদিকে মুনাফা হ্রাস, নেট সম্পদের মূল্য কমে যাওয়া, বড় অঙ্কের স্পেকট্রাম বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক চাপ বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার বার্তাও দিচ্ছে।

ফলে যারা দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত ডিভিডেন্ডকে অগ্রাধিকার দেন, তাদের জন্য গ্রামীণফোন এখনও আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে নতুন বিনিয়োগের আগে কোম্পানির পরবর্তী কয়েক প্রান্তিকের আয়, নগদ প্রবাহ ও ব্যয় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করাই হবে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।

সর্বশেষ