ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবন থেকে একটু দূরে গেলেই মিলবে গ্রামের বাজারের স্বাদ। পূর্বাচলের নীলা মার্কেট পেরিয়ে মাজার রোডে বসে এমনই এক কাঁচাবাজার। প্রতিদিন এখানে আসে আশপাশের এলাকার চাষিদের তাজা শাকসবজি, দেশি ফল, হাঁস-মুরগি, দুধ ও পুকুর-নদীর মাছ। শুধু স্থানীয় মানুষ নন, ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকেও অনেকে গাড়ি নিয়ে ছুটে আসেন বাজারটিতে।
এই বাজারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো মাঠ থেকে তুলে আনা টাটকা শাকসবজি। বড় দোকানের সংখ্যা এখানে কম। অধিকাংশ বিক্রেতাই নিজেদের জমিতে চাষ করা অল্প পরিমাণ সবজি নিয়ে প্রতিদিন বসেন। কেউ কেউ আশপাশের এলাকা থেকে সংগ্রহ করে আনেন কলমিশাক, মালঞ্চশাক, কচুশাক, ঢেঁকিশাক ও ঘেটকচুশাকসহ নানা ধরনের শাক।
পুঁইশাক, লাউশাক, মিষ্টিকুমড়ার শাক ও চালকুমড়ার শাক পাওয়া যাচ্ছে আঁটি ৩০ থেকে ৬০ টাকায়। সাদা শাপলার পাশাপাশি রয়েছে লাল ও নীলাভ শাপলাও, প্রতি আঁটি ৪০ থেকে ৫০ টাকা। পুঁইশাক, লাউপাতা, মিষ্টিকুমড়ার পাতা ও চালকুমড়ার পাতা মিলছে ২০ টাকা আঁটি।
এ ছাড়া বিভিন্ন শাক মিশিয়ে তৈরি পাঁচমিশালি শাকের আঁটি ৫০ টাকা। চুকুর বা টক পাতা, বিলাতি ধনে ও মিষ্টিকুমড়ার ফুল পাওয়া যাচ্ছে ১০ টাকা আঁটি। শজনেপাতার দাম ৫০ টাকা।
তাজা সবজির সমাহার
শাকের পাশাপাশি বাজারটিতে রয়েছে নানা ধরনের দেশি সবজি। চিচিঙ্গা, ঝিঙে, ধুন্দুল, ঢ্যাঁড়স, পটোল, বরবটি, টমেটো, কাঁকরোল, কচু, কচুর লতি, কচুমুখি, করলা, ডাঁটা, বেগুন, কাঁচা পেঁপে, শসা, গাজর ও বিভিন্ন ধরনের মরিচ রয়েছে বিক্রির তালিকায়।
আলুর মধ্যে সাধারণ আলুর পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে বগুড়ার লাল আলুও। কাঁচা চালকুমড়ার সঙ্গে রয়েছে মোরব্বা তৈরির উপযোগী পাকা চালকুমড়া। কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে পুঁইশাকের বীজ ও কাঁঠালের বীজ। জাতভেদে লেবুর দাম প্রতি ডজন ৭০ থেকে ১০০ টাকা।
শীতের সবজি শিমও পাওয়া যাচ্ছে বাজারে। প্রতি কেজির দাম ১৮০ টাকা। আর ভর্তা তৈরিতে জনপ্রিয় মৌ শিম বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা কেজি।
দেশি ফলেরও কমতি নেই
ভাদ্রের এই সময়ে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে পাকা তাল। আকারভেদে প্রতিটি তালের দাম ৩০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত।
আমের মৌসুম প্রায় শেষ হলেও কিছু জাতের আম এখনো পাওয়া যাচ্ছে। রয়েছে হলুদ রঙের বারোমাসি থাই কাটিমন, বারি-৩ ও আশ্বিনা আম। কাঁচা আমও মিলছে। আমের দাম পড়ছে ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকা।
এ ছাড়া আকারভেদে কাঁঠালের দাম ১৫০ থেকে ৭০০ টাকা। বাজারে রয়েছে ড্রাগন ফল, লটকন, আমড়া, দেশি পেয়ারা, ভেতরে লাল রঙের থাই পেয়ারা, পাকা পেঁপে, করমচা, শরিফা, লুকলুকি, আমলকী, আপেল, দেশি সবুজ মাল্টা, কমলা, আনার, ডাব, কতবেল, তরমুজ, বাঙ্গি, বেল, জাম্বুরা ও চালতা।
কলার মধ্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য। চম্পা কলা, বাংলা কলা, নরসিংদীর সাগর কলার পাশাপাশি তরকারি হিসেবে রান্নার উপযোগী আনাজি কলাও পাওয়া যায়।
হাঁস-মুরগি, ডিম ও দুধ
গ্রামীণ বাজারের অন্যতম আকর্ষণ দেশি হাঁস-মুরগি। এখানে দেশি মুরগি ও হাঁসের দাম প্রতি কেজি ৭০০ টাকা। দেশি হাঁসের ডিম প্রতি হালি ১০০ টাকা এবং দেশি মুরগির ডিম ১২০ টাকা। কোয়েল পাখির ডিম পাওয়া যাচ্ছে প্রতি হালি ৭০ টাকায়।
বাজারে বিক্রি হচ্ছে গরুর দুধও। প্রতি লিটারের দাম ১০০ টাকা।
দেশি মাছের আলাদা কদর
রাস্তার দুই পাশে রয়েছে দুটি মাছের দোকান। স্থানীয় নদী ও পুকুর থেকে আসা দেশি মাছের চাহিদাই এখানে বেশি। শিং, কই, টাকি, চিংড়ি, পাবদা ও ছোট মাছের পসরা দেখা যায়।
দেশি শিং বিক্রি হচ্ছে কেজি ৮০০ টাকা, কই ১ হাজার ২০০ টাকা, টাকি ৫০০ টাকা, চিংড়ি ৯০০ টাকা এবং ছোট মাছ ৩০০ টাকা কেজি দরে।
দাম একটু বেশি, তবু ক্রেতার ভিড়
বড় পাইকারি বাজারের সঙ্গে তুলনা করলে এখানকার কিছু পণ্যের দাম একটু বেশি মনে হতে পারে। তবু ক্রেতার কমতি নেই। কারণ, এই বাজারের মূল আকর্ষণ তাজা ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য।
বাজারের অধিকাংশ সবজি ক্ষেত থেকে তোলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এখানে চলে আসে। ফলে টাটকা সবজির স্বাদ ও পুষ্টিগুণ ধরে রাখার সুযোগ থাকে। এ কারণেই পূর্বাচল ও জলসিঁড়ি আবাসিক এলাকায় যাঁদের বাড়ি বা ফ্ল্যাট নির্মাণের কাজ চলছে, তাঁদের অনেকেই দিনের কাজ শেষে ঢাকায় ফেরার পথে এখান থেকে বাজার করে নেন।
সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও বাড়ে ভিড়। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে নীলা মার্কেট কিংবা পূর্বাচলের খোলা পরিবেশে ঘুরতে আসা অনেকেই ফেরার পথে মাজার রোডের এই বাজারে থামেন।
যেভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো এলাকা থেকে প্রথমে আসতে হবে কুড়িল বিশ্বরোডের বিআরটিসি কাউন্টারে। সেখান থেকে ২০ টাকা ভাড়ায় বিআরটিসি বাসে সরাসরি মাজার রোডের কাঁচাবাজার এলাকায় যাওয়া যায়। সিএনজিচালিত অটোরিকশায় জনপ্রতি ভাড়া প্রায় ৩০ টাকা।
নিজস্ব গাড়ি থাকলে অবশ্য যাতায়াত আরও সহজ।
সপ্তাহের সাত দিনই বসে এই বাজার। দুপুর থেকে শুরু হয়ে চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। তাই সময় করে একদিন ঘুরে আসতেই পারেন। টাটকা শাকসবজি, দেশি মাছ ও ফলমূলের পাশাপাশি ফেরার আগে মাটির তাওয়ায় তৈরি চিতই পিঠা আর বিভিন্ন ভর্তার স্বাদ নিতে ভুলবেন না।
























