ঢাকা   মঙ্গলবার ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

লাওসে কর্মী পাঠানো স্থগিত, পাসপোর্ট-টাকা না দেওয়ার সতর্কতা

জাতীয়

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১৬:১৫, ৬ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

লাওসে কর্মী পাঠানো স্থগিত, পাসপোর্ট-টাকা না দেওয়ার সতর্কতা

বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমিক নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট ও শ্রমিক শ্রেণির ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওস। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকবে। এ সুযোগে ভুয়া ভিসা, মিথ্যা চাকরির প্রস্তাব ও অননুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে প্রতারণার আশঙ্কায় বাংলাদেশি কর্মীদের সতর্ক করেছে সরকার। স্থগিতাদেশ চলাকালে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে পাসপোর্ট জমা না দেওয়া এবং কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে লাওসে বাংলাদেশি নাগরিকদের শ্রমিক নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট এবং শ্রমিক শ্রেণির ভিসা—এলএ-বি২—ইস্যুসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। চার মাসের এই স্থগিতাদেশ আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে।

মন্ত্রণালয় গত ২৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে লাওস সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানায়। একই সঙ্গে স্থগিতাদেশের সময়সীমায় লাওসে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সরকারি নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।

কেন ভিসা ও কর্মী নিয়োগ বন্ধ?

লাওসের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগ ও প্রবেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়ার নির্দিষ্ট কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে জানানো হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক।

তিনি জানান, বিষয়টি বিস্তারিত জানতে বাংলাদেশ কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে লাওসের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। বাংলাদেশে লাওসের নিজস্ব দূতাবাস না থাকায় পাশের দেশের দূতাবাসের মাধ্যমেও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে লাওসের শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম ‘দ্য লাওসিয়ান টাইমস’ জানিয়েছে, অবৈধ প্রবেশ, মানব পাচার, অননুমোদিত শ্রমিক সরবরাহ এবং বিদেশি শ্রমিক আনার পর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নিয়োগদাতাদের নিয়ন্ত্রণে আনতেই এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

লাওসের অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি, নিয়োগদাতা বা শ্রমিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের দেশটিতে প্রবেশ বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে না।

তবে শুধু বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রেই কেন এই স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে লাওসের নির্দেশনায় নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

পাসপোর্ট জমা দিলেই বিপদ

স্থগিতাদেশের সুযোগ নিয়ে ভুয়া চাকরির প্রস্তাব ও ভিসার কথা বলে প্রতারণার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে লাওসে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশি কর্মীদের বিশেষভাবে সতর্ক করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকা সময়ে কর্মসংস্থানের আশ্বাসে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছে পাসপোর্ট জমা দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে ভিসা বা চাকরির নামে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন থেকেও বিরত থাকতে হবে।

প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানান, লাওস ও কম্বোডিয়ার মতো দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনা রয়েছে। তাই এসব দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কাগজপত্র ও চাকরির তথ্য আরও কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে।

কর্মী কোন দেশে যাচ্ছেন, সেখানে কী কাজ করবেন, কতদিনের জন্য যাচ্ছেন এবং যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করবেন সেটি প্রকৃতপক্ষে অস্তিত্বশীল কি না—এসব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

অনুমোদন ছাড়া কর্মী নিলে জরিমানা

লাওস সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়া বাংলাদেশি শ্রমিক আনা বা নিয়োগ করলে সংশ্লিষ্ট নিয়োগদাতার বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে।

অনুমোদন ছাড়া শ্রমিক আনলে বা নিয়োগ করলে প্রতি ঘটনায় শ্রমিকপ্রতি ২৫ লাখ লাও কিপ বা প্রায় ১১০ মার্কিন ডলার জরিমানা হতে পারে। অন্য শ্রমিক ইউনিটে নিয়োগের উদ্দেশ্যে শ্রমিক আনলেও একই ধরনের জরিমানার বিধান রয়েছে।

এ ছাড়া অন্য কোনো শ্রমিক ইউনিটের জন্য নির্ধারিত কর্মীকে কাজে ব্যবহার বা গ্রহণ করলে নিয়োগদাতাকে শ্রমিকপ্রতি ২০ লাখ লাও কিপ বা প্রায় ৮৯ মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে হতে পারে।

অনুমোদন ছাড়া নির্ধারিত কর্মস্থলের বাইরে কাজ করলে সংশ্লিষ্ট শ্রমিককে প্রতি ঘটনায় ১০ লাখ লাও কিপ বা প্রায় ৪৪ মার্কিন ডলার জরিমানা করা হতে পারে। পাশাপাশি তাকে ৩০ দিনের মধ্যে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিধান রয়েছে।

দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে যাতায়াতসহ সংশ্লিষ্ট সব খরচ নিয়োগদাতা বা নিয়ম লঙ্ঘনকারী পক্ষকে বহন করতে হবে। একই ধরনের অপরাধ পুনরায় করলে জরিমানার পরিমাণ তিন গুণ হতে পারে এবং অতিরিক্ত আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।

লাওসে কত বাংলাদেশি কর্মী?

বাংলাদেশ থেকে লাওসে যাওয়া কর্মীদের বড় একটি অংশ নির্মাণ ও উৎপাদন খাতে কাজ করেন। দেশটিতে চীনা বিভিন্ন প্রকল্পেও কিছু বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তবে লাওসে বর্তমানে মোট কত বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হকের কাছে নেই।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে প্রায় ৩ হাজার বাংলাদেশি কর্মী লাওসে যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র নিয়েছেন। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮৩৫ জন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশিদের বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রধান গন্তব্যগুলোর মধ্যে লাওস উল্লেখযোগ্য নয়। দেশটিতে মূলত কিছু চীনা প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি কর্মীদের যাতায়াত রয়েছে।

ভুয়া কোম্পানির চাহিদাপত্রেও নজরদারি

সরকারের কাছে তথ্য এসেছে, কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি ভুয়া কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশ করে লাওসের নামে চাহিদাপত্র সংগ্রহ করে কর্মী পাঠানোর চেষ্টা করছে। এ কারণে কর্মী পাঠানোর আগে কাগজপত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আরও কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে।

সরকার শুধু লাওস নয়, কম্বোডিয়া এবং অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকিয়ে নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

তাই লাওসে যাওয়ার ক্ষেত্রে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো—চাকরি বা ভিসার আশ্বাসে পাসপোর্ট জমা দেওয়া যাবে না এবং যাচাই ছাড়া কাউকে টাকা দেওয়া যাবে না।

সর্বশেষ