২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দেওয়া হলেও সরকারি নীতিমালায় অনুমোদিত ছিল সর্বোচ্চ তিনটি। নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া অতিরিক্ত দুই বোনাসের অর্থ প্রায় ১১৬ কোটি টাকা। দেড় বছর আগে এই অর্থ ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হলেও এখনো তা আদায় করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে পারেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। নতুন করে গত ১১ সেপ্টেম্বর দেওয়া চিঠিতে আবারও বাড়তি অর্থ ফেরতের নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই দিন পর, ৭ আগস্ট, সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আফজাল করিমকে অবরুদ্ধ করেন একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁদের দাবি ছিল, বছরে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দিতে হবে। অথচ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, তিনটির বেশি বোনাস দেওয়ার সুযোগ ছিল না।
বোনাসের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকলে ২০ আগস্ট পদত্যাগ করেন ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী। এর আগে তাঁর নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ কর্মীদের চাপের মুখে নীতিমালার বাইরে গিয়ে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস অনুমোদন করে। বিষয়টি নিয়ে নিরীক্ষা আপত্তি ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এই সিদ্ধান্তে সম্মতি দেয়নি।
পরে ২৮ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগের আগপর্যন্ত তিনিও বিষয়টির সমাধানের চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত অর্থ ফেরত আনার ব্যবস্থা হয়নি। এ বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ব্যাংকটির একজন পরিচালক বলেন, একশ্রেণির কর্মচারী ‘মব’ করে বোনাস আদায় করায় প্রতিষ্ঠানটি এখন জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছে। উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এর তাৎক্ষণিক সমাধান কঠিন। তাঁর মতে, কর্মীদের হাতে টাকা চলে যাওয়ার পর তা ফেরত আনার বাস্তব সম্ভাবনাও কম।
বাড়তি অর্থ ফেরতের নির্দেশ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সোনালী ব্যাংকের এমডিকে চিঠি দিয়ে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া অতিরিক্ত দুই বোনাসের অর্থ ফেরত আনার নির্দেশ দেয়। কিন্তু নির্দেশ জারির পর দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ ও ২০২৫—দুই সালের নীতিমালার কোনোটিতেই সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচটি উৎসাহ বোনাস নেওয়ার অনুমতি ছিল না। অথচ ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের বিপরীতে তাঁরা পাঁচটি বোনাস পেয়েছেন।
বোনাস দেওয়ার পর সোনালী ব্যাংক সেটি অনুমোদনের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আবেদন করে এবং নীতিমালা লঙ্ঘনের জন্য ক্ষমাও চায়। তবে নিজেদের জারি করা নীতিমালা অমান্য করে পাঁচটি বোনাস অনুমোদন করেনি বিভাগটি।
গত ১১ সেপ্টেম্বর দেওয়া নতুন চিঠিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিষয়ে অসম্মতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া অতিরিক্ত দুই বোনাসের অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করে সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোনালী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটিতে বোনাস নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার ৫০০। নিয়মিত তিনটির পাশাপাশি তাঁরা আরও দুটি উৎসাহ বোনাস পেয়েছেন। প্রতিটি বোনাসের পরিমাণ মূলত এক মাসের মূল বেতনের সমান। ব্যাংকটির একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, একটি বোনাসের অর্থ প্রায় ৫৮ কোটি টাকা। সে হিসাবে বাড়তি দুই বোনাসের মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১৬ কোটি টাকা।
সোনালী ব্যাংকের এমডি ও সিইও শওকত আলী খান গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাঁচ বোনাসের সিদ্ধান্তটি আমি এ ব্যাংকে যোগ দেওয়ার আগেই নেওয়া হয়েছে। যেকোনোভাবেই হোক, টাকা যেহেতু পরিশোধ করা হয়ে গেছে, সেহেতু আমরা সরকারকে তা মেনে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। নতুন করে আবার একই অনুরোধ জানাব।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে যা উঠে আসে
সোনালী ব্যাংকের বোনাসসংক্রান্ত বিষয়ে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক একটি পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১১ মার্চ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের এমডিকে চিঠি দেয়। সেখানে বলা হয়, ২০২৩ সালের জন্য পাঁচটি উৎসাহ বোনাস বাবদ ব্যাংকটি ২৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের জন্য ৪০০ কোটি টাকা সংস্থান রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও উল্লেখ করে, সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব উৎসাহ বোনাস নীতিমালাতেও তিনটির বেশি বোনাস দেওয়ার বিধান নেই। তারপরও ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত ব্যাংকের ৮৭০তম পর্ষদ বৈঠকে পাঁচটি বোনাস দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠি পর্যালোচনায় দেখা যায়, অনুমোদনটি শর্তসাপেক্ষে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, ভবিষ্যতে কোনো নিরীক্ষা বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে আপত্তি উঠলে বাড়তি অর্থ ফেরত দিতে সংশ্লিষ্ট সবাই বাধ্য থাকবেন। এ জন্য তাঁদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত অঙ্গীকারনামাও নেওয়া হবে।
পাঁচ সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে বোনাস
সোনালী ব্যাংকের পাশাপাশি রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও অন্যান্য সরকারি ব্যাংকেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঢালাওভাবে উৎসাহ বোনাস দেওয়ার প্রবণতা ছিল। এ পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নতুন নির্দেশিকা জারি করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, তফসিলি বিশেষায়িত ব্যাংক, অ-তফসিলি বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য প্রণীত ওই নির্দেশিকায় উৎসাহ বোনাস দেওয়ার আগে নির্দিষ্ট সূচকে মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সোনালী, অগ্রণীসহ ছয়টি রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে পাঁচটি সূচক বিবেচনায় নিতে হবে। এগুলো হলো—চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হার, আমানত বৃদ্ধির হার, ঋণ ও অগ্রিম বৃদ্ধির হার, শ্রেণিকৃত ঋণ থেকে নগদ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে আদায়ের হার এবং অবলোপনকৃত ঋণ থেকে নগদ আদায়ের হার।
সূচকগুলোর মধ্যে চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হারকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ খাতে ৫০-এর বেশি নম্বর রয়েছে। মোট প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে বোনাসের সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া কর্মীরা সর্বাধিক তিনটি উৎসাহ বোনাস পাবেন। নম্বর কম হলে বোনাসের সংখ্যাও কমবে। আর নম্বর নির্ধারিত সীমার নিচে থাকলে কোনো বোনাস দেওয়া হবে না।
অর্থাৎ নতুন নির্দেশনায় উৎসাহ বোনাসের পরিমাণ আর শুধু কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে না। ব্যাংকের আর্থিক ফলাফল, আমানত ও ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণ আদায়ের সক্ষমতার সঙ্গে বোনাসের সংখ্যা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত করা হয়েছে।





















