শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৬২টি কোম্পানি সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ সতর্কসংকেত জারি করেছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এর মধ্যে ৩২টি কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে এবং ৩০টি কোম্পানি আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বা অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের সচেতন করতে সম্প্রতি ডিএসই তাদের ওয়েবসাইটে পৃথক দুটি তালিকা প্রকাশ করেছে।
ডিএসই-সংশ্লিষ্টরা জানান, আর্থিকভাবে দুর্বল ও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগ করে যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে না পড়েন, সে জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মূলত এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে ‘রেড এলার্ট’ বা সতর্কসংকেত জারি করা হয়েছে, যাতে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারে বিনিয়োগের আগে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করেন।
অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির পর কড়াকড়ি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বন্ধ ও দুর্বল মানের কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। এরই মধ্যে এমন দুটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন তাৎক্ষণিক নির্দেশে স্থগিত করা হয়েছে। কোম্পানি দুটি হলো শ্যামপুর সুগার ও সোনারগাঁও টেক্সটাইলস।
এ অবস্থায় দ্বিতীয় ধাপে দুর্বল ও আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিগুলোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সতর্কসংকেত জারি করল ডিএসই।
ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুজহাত আনোয়ার বলেন,
“বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টিকে আমরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। বিনিয়োগকারীরা যাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির হালনাগাদ সব তথ্য একসঙ্গে জানতে পারেন, সেই চেষ্টাও করা হচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে বন্ধ ও আর্থিকভাবে ঝুঁকিতে থাকা কোম্পানিগুলোর আলাদা তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। বাজারে কারসাজি বন্ধে আমরা আরও সক্রিয় ও জোরদার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চাই। আগে বিচ্ছিন্নভাবে নানা কাজ করা হলেও এখন আমরা গুছিয়ে করার চেষ্টা করছি।”
বন্ধ কোম্পানির তালিকায় ৩২ প্রতিষ্ঠান
ডিএসইর প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী বন্ধ কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
অ্যাপোলো ইস্পাত, আরামিট সিমেন্ট, আজিজ পাইপস, বারাকা পাওয়ার, বিডি ওয়েল্ডিং, দুলামিয়া কটন, এমারেল্ড অয়েল, ফ্যামিলিটেক্স, জিবিবি পাওয়ার, জেনারেশন নেক্সট, হামিদ ফেব্রিকস, খুলনা পাওয়ার, খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, মেঘনা পিইটি, মেট্রো স্পিনিং, মিথুন নিটিং, নিউলাইন ক্লথিংস, নর্দার্ন জুট, নুরানী ডায়িং, প্যাসিফিক ডেনিমস, প্রাইম টেক্সটাইলস, রহিমা ফুড, আরএসআরএম স্টিল, রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ, শ্যামপুর সুগার মিলস, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, তুংহাই নিটিং, উসমানিয়া গ্লাস, ইয়াকিন পলিমার এবং জাহিন স্পিনিং।
তবে সতর্কসংকেত জারির পরও বাজারে এসব কোম্পানির শেয়ারের প্রতি আগ্রহ কমেনি। গতকাল ৩২টি বন্ধ কোম্পানির মধ্যে ২২টির শেয়ারদর বেড়েছে, ৬টির কমেছে এবং ৪টির দর অপরিবর্তিত ছিল। এর মধ্যে হামিদ ফেব্রিকস, প্রাইম টেক্সটাইলস ও নিউলাইন ক্লথিংসের শেয়ারের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
বিএসইসির নতুন নেতৃত্বের কড়া বার্তা
গত ৪ জুন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। সরকার চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় মাসুদ খানকে। একই সঙ্গে আরও তিনজন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়।
দায়িত্ব গ্রহণের দিন সংবাদ সম্মেলনে মাসুদ খান ঘোষণা দেন, বাজার কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কমিশন রিয়েল টাইম বা প্রকৃত সময়ভিত্তিক ব্যবস্থা নেবে। বিশেষ করে জেড শ্রেণিভুক্ত কোম্পানিগুলোর ওপর শুরু থেকেই কঠোর নজরদারি থাকবে। তিনি জানান, বিএসইসির সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা।
পরে নবনিযুক্ত কমিশন ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে নির্দেশনা দেওয়া হয়, দুর্বল মানের কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম যদি সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তাহলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে লেনদেন স্থগিত করে মূল্যবৃদ্ধির কারণ দ্রুত তদন্ত করতে হবে।
বিএসইসির এই নির্দেশনার পর ডিএসই অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি হওয়া দুর্বল কোম্পানিগুলোর শেয়ার লেনদেন তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কোম্পানিসংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য নিয়মিত প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় আরও ৩০ কোম্পানি
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত ৪২টি কোম্পানিকে ‘গোয়িং কনসার্ন থ্রেট’ বা ‘ব্যবসা পরিচালনায় অনিশ্চয়তার ঝুঁকিতে’ রয়েছে বলে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষকেরা। অর্থাৎ নগদ অর্থসংকটসহ বিভিন্ন কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক ব্যবসা পরিচালনা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
ডিএসই নিরীক্ষকদের মতামতের ভিত্তিতে এসব প্রতিষ্ঠানের পৃথক তালিকাও প্রকাশ করেছে। তালিকাভুক্ত ৪২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০টি আবার বন্ধ কোম্পানির তালিকাতেও রয়েছে। এছাড়া দুটি কোম্পানির লেনদেন বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। ফলে কার্যত ৩০টি কোম্পানি ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এই তালিকার কোম্পানিগুলো হলো—
অলটেক্স, আনলিমা ইয়ার্ন, বিডি সার্ভিসেস, বিডিথাই ফুড, বিআইএফসি, সেন্ট্রাল ফার্মা, ঢাকা ডায়িং, ডরিন পাওয়ার, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, গ্লোবাল হেভি কেমিক্যালস, জিএসপি ফাইন্যান্স, ইন্দো-বাংলা ফার্মা, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, ইনটেক, জুট স্পিনার্স, খান ব্রাদার্স পিপিওভেন ব্যাগ, মেঘনা সিমেন্ট, এনটিসি, পিপলস লিজিং, প্রিমিয়ার লিজিং, প্রাইম ফাইন্যান্স, সাফকো স্পিনিং, সোনারগাঁও টেক্সটাইলস, সানলাইফ ইনস্যুরেন্স, তাল্লু স্পিনিং, উসমানিয়া গ্লাস এবং ঝিল বাংলা।
এ ছাড়া লেনদেন স্থগিত থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকও এই ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য বার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, ডিএসইর এই উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্বল কোম্পানি সম্পর্কে আগাম সতর্ক করবে। একই সঙ্গে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ও সম্ভাব্য বাজার কারসাজি নিয়ন্ত্রণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জের নজরদারি আরও জোরদার হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
























