সংবাদমাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ এবং সমালোচনার মুখে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কেটের (বিএএসএম) কার্যক্রম চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিচালনা পর্ষদ। প্রতিষ্ঠানটি বিলুপ্ত করার প্রাথমিক পরিকল্পনা থেকে সরে এসে এবার পরিচালন ব্যয় কমাতে ঢাকার দিলকুশার জীবন বীমা ভবন থেকে মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) ভবনে অবস্থিত ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের (সিএমএসএফ) কার্যালয়ে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সেখানে বিএএসএমের কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে অফিস ভাড়া ও সার্ভিস চার্জ বাবদ প্রতি মাসে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মো. শফিউল আযম জানিয়েছেন, বিএএসএমের কার্যক্রম স্থগিত বা বন্ধ করা হচ্ছে না।
বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর আগে বিএএসএমের পরিচালনা পর্ষদের এক সভায় প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার প্রাথমিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর সমালোচনা তৈরি হলে পর্ষদ সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করে। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালু রাখা এবং ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ‘বিনিয়োগ শিক্ষামালা গেজেট’-এর আইনি কাঠামোর আওতায় বিএএসএমকে একটি স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। দেশের অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের টেকসই উন্নয়নে বিনিয়োগকারীদের আর্থিক সচেতনতা বাড়ানো, বিনিয়োগ শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া এবং বাজারের পেশাজীবীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও দ্রুত দক্ষতা বৃদ্ধির কর্মসূচি পরিচালনায় বিএএসএমের মতো প্রতিষ্ঠানের বিকল্প সীমিত। অন্যদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট (বিআইসিএম) শেয়ারবাজার বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা ও একাডেমিক ডিগ্রি প্রদানে কাজ করছে। বিএএসএমের প্রধান লক্ষ্য হলো বিএসইসির অধীনে ব্যবহারিক দক্ষতা উন্নয়ন, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ে বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা।
প্রতিষ্ঠানটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে শেয়ারবাজারের বিভিন্ন পেশাজীবী ও অংশীজনসহ আট হাজারের বেশি প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ ও পেশাগত শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ব্রোকারেজ হাউস, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, মার্চেন্ট ব্যাংক, স্টক ব্রোকার ও ডিলার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালক, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ও কোম্পানি সচিবেরা অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া তথ্যভিত্তিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সচেতনতা বাড়াতে শতাধিক সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে প্রশাসনিক জটিলতার কারণে গত এক বছর ধরে বিএএসএমে কোনো স্থায়ী মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ওপর নানা ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমের পরিবর্তে টিকটকভিত্তিক কনটেন্ট তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য ব্যাহত হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত ও বিকাশমান শেয়ারবাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ কারণে সাময়িক আর্থিক বা প্রশাসনিক সংকটের কারণে বিএএসএমের মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ না করে এর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, শেয়ারবাজারের টেকসই উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগকারীদের আর্থিক স্বাক্ষরতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিএএসএমের বাজেট ও পরিচালন সক্ষমতা জোরদার করা প্রয়োজন।
বিএএসএমের ওয়েবসাইটে দেওয়া বাণীতে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাসুদ খান উল্লেখ করেছেন, সুসংহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হলো শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা। এই প্রবৃদ্ধির সুফল দেশের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে দেশব্যাপী আর্থিক স্বাক্ষরতা ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিএএসএম সরকারের প্রধান অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।
সার্বিক বিষয়ে বিএএসএমের বর্তমান মহাপরিচালক ও বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক কামরুল আনাম খান জানান, পরিচালনা পর্ষদের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে বিএএসএমের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আপাতত নিজস্ব তহবিল ব্যবহার করেই প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
























