ঢাকা   সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

মিউচুয়াল ফান্ডে ক্ষুদ্র সঞ্চয়, বাংলাদেশের সামনে ৫০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:২০, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মিউচুয়াল ফান্ডে ক্ষুদ্র সঞ্চয়, বাংলাদেশের সামনে ৫০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা

বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আর্থিক লক্ষ্য পূরণের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে মিউচুয়াল ফান্ড ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রে অর্ধেকেরও বেশি পরিবার মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে তাদের সঞ্চয় বিনিয়োগ করে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ‘সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান’ বা এসআইপির মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও নিয়মিত বিনিয়োগের সংস্কৃতি গড়ে ওঠায় সাধারণ মানুষের মধ্যে মিউচুয়াল ফান্ড ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

বাংলাদেশে অবশ্য ঐতিহ্যগতভাবে সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানত এবং সরাসরি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ওপরই সাধারণ মানুষের নির্ভরতা বেশি। তবে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তিত আর্থিক চাহিদা পূরণে এসব মাধ্যম সবসময় যথেষ্ট নাও হতে পারে।

দেশে মিউচুয়াল ফান্ডের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) হাত ধরে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এই খাত মূলত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত মিউচুয়াল ফান্ড এখনো সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের প্রধান বিনিয়োগ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারেনি।

খুচরা বিনিয়োগ বাড়লে বদলাতে পারে চিত্র

মিউচুয়াল ফান্ডে সাধারণ বা খুচরা বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করা শুধু এ খাতের সম্পদ বাড়ানোর বিষয় নয়। এর মাধ্যমে পরিবারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে পেশাদার ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে প্রাতিষ্ঠানিক মূলধনে রূপান্তর করা সম্ভব। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়লে বাজারের গভীরতা ও স্থিতিশীলতাও বাড়তে পারে।

সম্প্রতি সরকার, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এ খাতের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এর মধ্যে কর রেয়াতের সুবিধার আওতায় মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সীমা ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের লভ্যাংশ আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে চূড়ান্ত কর নির্ধারণ উল্লেখযোগ্য।

তবে এ খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এখনো বেশ কিছু কাঠামোগত বাধা দূর করা প্রয়োজন।

ভারতের আদলে বড় বাজারের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এখনো বিপুলসংখ্যক খুচরা বিনিয়োগকারীর ওপর নির্ভরশীল। দৈনিক লেনদেনের বড় অংশ সাধারণ বা ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আসায় বাজারে অনেক সময় স্বল্পমেয়াদি ও অনুমাননির্ভর লেনদেনের প্রবণতা দেখা যায়।

এই সঞ্চয়ের একটি অংশ যদি পেশাদার ফান্ড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শেয়ারবাজারে আসে, তাহলে বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

ভারতে বর্তমানে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের আকার প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলার বা ০.৯ ট্রিলিয়ন ডলার। দেশটির মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পের সম্প্রসারণে এসআইপি থেকে আসা নিয়মিত বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশে মাথাপিছু ব্যাংক আমানত ভারতের তুলনায় প্রায় অর্ধেক হলেও, ভারতের মাথাপিছু মিউচুয়াল ফান্ড সম্পদের অর্ধেক অর্জন করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের এই খাতের আকার বড় পরিসরে বাড়তে পারে। সংশ্লিষ্টদের একটি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে থাকা বাংলাদেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাত ভবিষ্যতে ৪৫ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জনপ্রিয় করতে চারটি অগ্রাধিকার

১. ডিজিটাল রূপান্তর ও সহজ বিনিয়োগ প্রক্রিয়া

মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কাগজপত্র ও ম্যানুয়াল স্বাক্ষরনির্ভর জটিলতা কমিয়ে পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করতে হবে। এ জন্য এপিআইভিত্তিক একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা যেতে পারে।

বিনিয়োগের প্রক্রিয়াটি যেন বিকাশ বা রকেটের মাধ্যমে ডিপিএস খোলার মতো সহজ ও দ্রুত হয়, সে ধরনের ব্যবস্থা চালু করা গেলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই মিউচুয়াল ফান্ডের সুযোগ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

২. খুচরা বিক্রয় ও ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা

শুধু পণ্য তৈরি করলেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা সম্ভব নয়। মিউচুয়াল ফান্ডের ঝুঁকি, সম্ভাব্য রিটার্ন ও দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের সচেতন করতে প্রশিক্ষিত সেলস টিম এবং শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক প্রয়োজন।

৩. হাইব্রিড ফান্ড ও বৈচিত্র্যময় পণ্য

বর্তমানে বাজারের অধিকাংশ মিউচুয়াল ফান্ড ইকুইটি বা শেয়ারকেন্দ্রিক। এতে বাজারের ওঠানামার সঙ্গে বিনিয়োগের ঝুঁকিও বাড়ে।

সাধারণ ও শরিয়াহভিত্তিক—উভয় ধারায় ইকুইটি ও বন্ডের সমন্বয়ে হাইব্রিড ফান্ড চালু করা গেলে বিনিয়োগকারীদের জন্য বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরি হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও বাড়বে বিকল্প।

৪. মানসম্মত সিকিউরিটিজের সরবরাহ নিশ্চিত করা

মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পের বিকাশের জন্য শুধু বিনিয়োগকারীর অর্থ সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়; সেই অর্থ বিনিয়োগের জন্য মানসম্মত শেয়ার ও বন্ডের পর্যাপ্ত সরবরাহও প্রয়োজন।

ভালো মানের সিকিউরিটিজের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বাড়ানো গেলে মিউচুয়াল ফান্ডগুলো সাধারণ মানুষের সঞ্চয় দীর্ঘমেয়াদে আরও কার্যকরভাবে বিনিয়োগ করতে পারবে।

ক্ষুদ্র সঞ্চয় থেকে প্রাতিষ্ঠানিক মূলধন

শিক্ষণীয় ও দূরদর্শী নিয়ন্ত্রক কাঠামোর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ ব্যবস্থা, শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এবং বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ পণ্য তৈরি করা গেলে দেশের গৃহস্থালির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক মূলধনে রূপান্তর করা সম্ভব।

শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এর ফলে একদিকে যেমন মিউচুয়াল ফান্ড খাতের আকার বাড়তে পারে, অন্যদিকে শেয়ারবাজারেও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের ভিত্তি শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে ৪৫ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বাজারের হিসাবটি একটি সম্ভাব্যতা-ভিত্তিক অনুমান; বাস্তবে তা অর্জনের জন্য বিনিয়োগকারীর আস্থা, পণ্যের মান, নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও বাজারের গভীরতা—সবগুলো ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি উন্নতি প্রয়োজন।