বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ এখন আর শুধু ব্যাংকের হিসাবের সমস্যা নয়; এটি আমানতকারীদের আস্থা, ঋণপ্রবাহ ও সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মার্চ শেষে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।
তবে শুধু ঋণের পরিমাণ দেখলে সংকটের পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে বড় কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিপুল ঋণ, ঋণখেলাপি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওপর ঝুঁকির বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে ছয়টি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা ব্যক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঋণের কারণে বিভিন্ন ব্যাংকের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো—এস আলম গ্রুপ, আরামিট গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ ও ওরিয়ন গ্রুপ।
এস আলম গ্রুপ
চট্টগ্রামের মোহাম্মদ সাইফুল আলমের নেতৃত্বাধীন এস আলম গ্রুপ ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর একটি। বিভিন্ন ব্যাংকে গ্রুপটির ঋণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও তদন্ত হয়েছে।
বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশসহ কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে এস আলম-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ ও মালিকানা সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। বড় ঋণগ্রহীতাদের অর্থ ও সম্পদ শনাক্ত এবং উদ্ধারের উদ্যোগেও এস আলম-সংশ্লিষ্ট ঋণের বিষয়টি রয়েছে।
আরামিট গ্রুপ
ছয়টি বড় শিল্পগোষ্ঠীর তালিকায় রয়েছে চট্টগ্রামভিত্তিক আরামিট গ্রুপও। বিভিন্ন অনুসন্ধান ও অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগে গ্রুপটির ঋণ, সম্পদ এবং বিদেশে থাকা সম্ভাব্য সম্পদের তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
ব্যাংকগুলোর লক্ষ্য হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ঋণ ও সম্পদের প্রকৃত অবস্থা চিহ্নিত করে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ উদ্ধারের সুযোগ তৈরি করা।
বেক্সিমকো গ্রুপ
বাংলাদেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী বেক্সিমকোও ব্যাংকঋণ নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে গ্রুপটির বড় অঙ্কের ঋণ রয়েছে এবং এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জনতা ব্যাংকে বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং বিভিন্ন ব্যাংক মিলিয়ে গ্রুপটির মোট ঋণ প্রায় ৫৩ হাজার ৪২ কোটি টাকা। এসব ঋণের বড় অংশ খেলাপি হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।
সিকদার গ্রুপ
ছয়টি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর তালিকায় রয়েছে সিকদার গ্রুপ। প্রয়াত জয়নুল হক সিকদারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নামও বড় ঋণ ও ব্যাংকঝুঁকির আলোচনায় এসেছে।
গ্রুপটির ঋণ এবং বিদেশে থাকা সম্ভাব্য সম্পদ শনাক্তে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর অনুসন্ধানের বিষয়টি সামনে এসেছে।
নাসা গ্রুপ
নাসা গ্রুপও ব্যাংক খাতের বড় ঋণগ্রহীতাদের আলোচনায় রয়েছে। গ্রুপটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের চেয়ারম্যান ছিলেন।
আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নাসা গ্রুপের ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার ২১৪ কোটি টাকা এবং এর প্রায় পুরোটাই খেলাপি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওরিয়ন গ্রুপ
ষষ্ঠ গোষ্ঠী ওরিয়ন গ্রুপ। বিভিন্ন খাতে ব্যবসা করা এই শিল্পগোষ্ঠীর ঋণও একাধিক ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কিত।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের একটি অগ্রগতি প্রতিবেদনে ওরিয়ন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার ১২ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়েছিল। এসব ঋণের কারণে একাধিক ব্যাংক ঝুঁকিতে পড়ার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বড় ঋণগ্রহীতাদের অর্থ ও সম্ভাব্য বিদেশি সম্পদের তথ্য সংগ্রহে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে।
শুধু ছয় গোষ্ঠী নয়, সংকটের শিকড় ব্যাংক পরিচালনায়
তবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকটকে শুধু ছয়টি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।
ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো, পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা, ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, অডিট এবং ঋণ আদায়ের আইনি কাঠামো—সবকিছুর কার্যকারিতার সঙ্গে খেলাপি ঋণের বিষয়টি জড়িত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও দেখা যায়, জুন ২০২৬ শেষে ১০টি ব্যাংকের কাছেই মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশ কেন্দ্রীভূত ছিল।
এ অবস্থায় ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করতে তিনটি কাঠামোগত সংস্কার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
১. মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন
বড় শেয়ারধারকরা তাঁদের মালিকানাগত অধিকার রাখবেন। তবে ব্যাংকের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পেশাদার ও স্বাধীন ব্যবস্থাপনার ভূমিকা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পরিচালনা পর্ষদে যোগ্য ও স্বাধীন ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে পরিচালকদের স্বার্থের সংঘাত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে দেওয়া ঋণের ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
২. পরিবারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ সীমিত করা
একটি পরিবারের একাধিক সদস্য দীর্ঘদিন ধরে একই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই একই পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা ও মেয়াদ নিয়ে কার্যকর সীমা, পরিচালকদের যোগ্যতা ও স্বাধীনতা এবং তাঁদের ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রকাশের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে Related Party Lending বা সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণের বিষয়েও। পরিচালক, বড় শেয়ারধারক, তাঁদের পরিবার কিংবা তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংকের ঋণসম্পর্ক থাকলে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে।
এ ধরনের ঋণ পুরোপুরি নিষিদ্ধ না হলেও ঋণ অনুমোদনের সময় প্রকৃত ব্যবসায়িক সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ, জামানত এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
৩. দুর্বল ব্যাংকের দ্রুত পুনর্গঠন
দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল অবস্থায় থাকা ব্যাংকগুলোকে অনির্দিষ্টকাল সহায়তা দিয়ে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠন, একীভূতকরণ কিংবা রেজোলিউশনের আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে একীভূত করলেই সমস্যার সমাধান হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। একীভূতকরণের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রকৃত সম্পদ, দায়, খেলাপি ঋণ এবং মূলধন ঘাটতি নির্ধারণ করা জরুরি।
একই সঙ্গে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং অনিয়ম বা ঋণখেলাপির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
আমানতকারীদের আস্থাই শেষ কথা
কোনো ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতার খবর ছড়িয়ে পড়লে আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক অর্থ তুলে নিতে চাইলে ব্যাংকের তারল্যের ওপর চাপ বাড়ে।
তাই খেলাপি ঋণ কমানো মানে শুধু ব্যাংকের হিসাব পরিষ্কার করা নয়। এর সঙ্গে আমানতকারীদের আস্থা, বিনিয়োগ, ব্যবসায়িক ঋণপ্রবাহ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও জড়িত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য দেখাচ্ছে, খেলাপি ঋণের অনুপাত সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে জুন ২০২৬-এ ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে নেমেছে। তবে একই সময়ে খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকার ওপরে রয়েছে। অর্থাৎ অনুপাত কিছুটা কমলেও ব্যাংকিং খাতের সমস্যার আকার এখনো বড়।
সামনে কী করতে হবে?
বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু পুরোনো ঋণ উদ্ধারের উদ্যোগ নিলেই হবে না। ভবিষ্যতে একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি না হওয়ার জন্য ঋণ দেওয়ার আগে কঠোর যাচাই, ঋণ দেওয়ার পর নিয়মিত নজরদারি এবং পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন—স্বচ্ছ মালিকানা কাঠামো, স্বাধীন ব্যাংক ব্যবস্থাপনা, পরিবারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণে সীমা, Related Party Lending-এর কঠোর তদারকি, শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দুর্বল ব্যাংকের দ্রুত পুনর্গঠন।
এই সংস্কারগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে একদিকে বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধারের পথ শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও আমানতকারীদের আস্থা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
























