দেশের শেয়ারবাজারে মার্জিন ঋণের ঝুঁকি এখনও বড় উদ্বেগের কারণ। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১০৫টি ব্রোকারেজ হাউস ও ৪১টি মার্চেন্ট ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনার জন্য মোট ১৬ হাজার ৪০ কোটি টাকা মার্জিন ঋণ দিয়েছে। কিন্তু শেয়ারের দাম কমে যাওয়ায় এর মধ্যে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা নেগেটিভ ইক্যুইটি হয়ে গেছে।
অর্থাৎ, অনেক বিনিয়োগকারীর নিজস্ব মূলধন পুরোপুরি শেষ হওয়ার পাশাপাশি ঋণের বড় অংশও আর আদায়যোগ্য অবস্থায় নেই। গত মে মাস পর্যন্ত এই চিত্র পাওয়া গেছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বিএসইসি মার্জিন ঋণ বিধিমালা আরও শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বাজারে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।
বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, আগের কমিশন মার্জিন ঋণের নিয়ম এতটাই কঠোর করেছিল যে বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বর্তমান কমিশন নিয়ম এতটাই শিথিল করার পথে হাঁটছে, যা ভবিষ্যতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাদের ভাষায়, দুটি চরম অবস্থানের কোনোটিই বাজারের জন্য ভালো নয়।
দেশের একটি শীর্ষ মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী বলেন, ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসের অন্যতম বড় কারণ ছিল নিয়ন্ত্রণহীন মার্জিন ঋণ। তাই নতুন বিধিমালা প্রণয়নের সময় অতীতের সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রাখা জরুরি।
বাজার-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত মে মাস শেষে নেগেটিভ ইক্যুইটির পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭ হাজার ৮২০ কোটি টাকা মূল ঋণ এবং প্রায় ২ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা স্থগিত সুদ।
তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ১০২টি ব্রোকারেজ হাউস প্রায় ৯৬ হাজার ৬১২টি মার্জিন অ্যাকাউন্টে ৯ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এর বিপরীতে নেগেটিভ ইক্যুইটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৩৩ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের তিনটি ব্রোকারেজ হাউস ৫ হাজার ৭২১ জন বিনিয়োগকারীকে ৩২ কোটি টাকা মার্জিন ঋণ দিয়েছে, যার বিপরীতে ২৫ কোটি টাকা নেগেটিভ ইক্যুইটি রয়েছে। এছাড়া ৪১টি মার্চেন্ট ব্যাংক ২৯ হাজার ১৯১ জন বিনিয়োগকারীকে ৬ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা মার্জিন ঋণ দিয়েছে। এর বিপরীতে নেগেটিভ ইক্যুইটির পরিমাণ ৪ হাজার ৯২০ কোটি টাকা।
গত ১৯ জুলাই প্রকাশিত সংশোধনী প্রস্তাবে বিএসইসি বলেছে, মূলধন পর্যাপ্ততা নিশ্চিত না করেও ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংক মার্জিন ঋণ দিতে পারবে। এছাড়া, লভ্যাংশের হার যাই হোক, 'বি' ক্যাটেগরির শেয়ারকেও মার্জিন ঋণের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, আগের বিধিমালা বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব ছিল। তবে বর্তমান কমিশনের প্রস্তাবও অতিরিক্ত শিথিল। তার মতে, খুব কম লভ্যাংশ দেওয়া 'বি' ক্যাটেগরির শেয়ারকে মার্জিনযোগ্য করা হলে বাজারে কারসাজির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এদিকে নতুন প্রস্তাবের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা খাতে মার্জিন ঋণের যোগ্যতা নির্ধারণে পিই (P/E) রেশিওর পরিবর্তে পিবি (P/B) রেশিও ব্যবহারের পরিকল্পনা। (পিবি (P/B) রেশিও বা Price-to-Book Ratio হলো একটি কোম্পানির বাজারমূল্য (Market Price) তার বইমূল্যের (Book Value) তুলনায় কত গুণে লেনদেন হচ্ছে, তার একটি সূচক।
সহজ ভাষায়: একটি কোম্পানির প্রকৃত সম্পদের (সম্পদ থেকে দায় বাদ দিলে যা থাকে) তুলনায় বিনিয়োগকারীরা শেয়ারটির জন্য কত দাম দিতে রাজি, সেটাই P/B রেশিও দিয়ে বোঝা যায়।)
এ বিষয়ে প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, জীবন বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন যৌক্তিক হতে পারে। তবে সাধারণ বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে পিই রেশিও ৩০ বহাল রাখাই বাজারের জন্য বেশি উপযোগী হবে।





















