পানি, খাবার ও বাতাসের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। ৫ মিলিমিটারের কম আকারের এসব কণাকে সাধারণভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। বোতলজাত পানি থেকে শুরু করে সামুদ্রিক খাবার, ঘরের ধুলা ও সিন্থেটিক কাপড়—বিভিন্ন উৎসে এসব কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে থাকলেও মানবদেহে এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে এখনো আরও গবেষণা প্রয়োজন।
যেভাবে শরীরে প্রবেশ করছে
মাইক্রোপ্লাস্টিক মূলত তিনটি পথে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে—খাদ্য ও পানীয়, শ্বাসপ্রশ্বাস এবং পরিবেশগত সংস্পর্শের মাধ্যমে।
খাদ্য ও পানীয়: পানি, সামুদ্রিক খাবার, লবণসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার সংরক্ষণ বা অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শেও প্লাস্টিক থেকে কণা ও রাসায়নিক পদার্থ খাবারে স্থানান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শ্বাসপ্রশ্বাস: ঘরের ধুলা, সিন্থেটিক তন্তু ও বিভিন্ন শিল্পকারখানা থেকে বাতাসে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা ছড়াতে পারে। এসব কণা শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে।
ত্বক ও প্রসাধনী: কিছু প্রসাধনীতে অতীতে মাইক্রোবিড ব্যবহারের নজির থাকলেও মানুষের শরীরে ত্বকের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উল্লেখযোগ্য শোষণ কতটা হয়, সে বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ সীমিত।
রক্ত ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে মাইক্রোপ্লাস্টিক
গবেষণায় মানুষের রক্তসহ শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে শরীরে এগুলোর উপস্থিতি পাওয়া মানেই নির্দিষ্ট রোগের কারণ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে এখনো পৌঁছানো যায়নি।
২০২৪ সালে New England Journal of Medicine-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ক্যারোটিড ধমনির প্লাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। যেসব রোগীর প্লাকে এসব কণা শনাক্ত হয়েছিল, তাঁদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা মৃত্যুর সম্মিলিত ঝুঁকি বেশি ছিল। তবে গবেষণাটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক হওয়ায় মাইক্রোপ্লাস্টিকই ওই ঝুঁকি বাড়িয়েছে—এমন সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করে না।
এ গবেষণার ফল নিয়েও বৈজ্ঞানিক মহলে কিছু প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে নমুনা দূষণের সম্ভাবনা নিয়ে। তাই মাইক্রোপ্লাস্টিকের সঙ্গে হৃদ্রোগ বা স্ট্রোকের সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি
গবেষণাগারে এবং কিছু মানবভিত্তিক গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও কোষীয় পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্লাস্টিকের সঙ্গে থাকা কিছু রাসায়নিক উপাদান নিয়েও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা চলছে।
তবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে নিশ্চিতভাবে ক্যানসার, বন্ধ্যত্ব, অ্যাজমা বা ফুসফুসের নির্দিষ্ট রোগ হয়—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত মানবপ্রমাণ এখনো নেই। WHO-ও বর্তমান তথ্যের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে আরও মানসম্মত গবেষণার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।
কীভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমাবেন?
মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা বাস্তবে কঠিন। তবে দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসে এর সংস্পর্শ কমানো সম্ভব।
প্লাস্টিকের বদলে বিকল্প পাত্র ব্যবহার করুন: পানি ও খাবার সংরক্ষণে সম্ভব হলে কাচ, স্টেইনলেস স্টিল বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।
গরম খাবারে প্লাস্টিক এড়িয়ে চলুন: বিশেষ করে প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম করা বা দীর্ঘ সময় গরম খাবার রাখা থেকে বিরত থাকা ভালো।
প্লাস্টিক বোতলের ব্যবহার কমান: সম্ভব হলে নিরাপদ পানির উৎস থেকে পানি নিয়ে পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাচ বা স্টিলের বোতল ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঘরের ধুলা কমান: নিয়মিত ভেজা কাপড়ে ঘর পরিষ্কার করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভ্যাকুয়াম ব্যবহার করলে বাতাসে ভাসমান ধুলা ও তন্তুর পরিমাণ কমানো সম্ভব।
সিন্থেটিক তন্তুর ব্যবহার কমাতে পারেন: সম্ভব হলে সুতি, লিনেন বা অন্যান্য প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক বেছে নেওয়া যেতে পারে।
প্রক্রিয়াজাত ও অতিরিক্ত প্লাস্টিক-মোড়ানো খাবার কমান: তাজা ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া ভালো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার বদলে অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো। WHO-র মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের মানবস্বাস্থ্যে প্রকৃত ঝুঁকি সম্পর্কে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বাকি। তবে প্লাস্টিক দূষণ কমানো পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য সামগ্রিকভাবেই উপকারী।
























