ঢাকা   বৃহস্পতিবার ২০ আগস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩

জিইডির প্রতিবেদন

৫ বছরে মাথাপিছু আয় ৪,৫৯১ ডলার, প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৮ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য

অর্থ ও বাণিজ্য

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১৮:০৭, ২০ আগস্ট ২০২৬

৫ বছরে মাথাপিছু আয় ৪,৫৯১ ডলার, প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৮ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য

আগামী পাঁচ বছরে দেশের মাথাপিছু গড় আয় সাড়ে চার হাজার ডলারে উন্নীত এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৮ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতে সংস্কার এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) ‘ট্রান্সফর্মিং ইকোনমি ফ্রম ফ্রেজাইলিটি টু প্রসপারিটি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরের এই পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ৪ হাজার ৫৯১ ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে মাথাপিছু গড় আয় ছিল ২ হাজার ৯৫৮ ডলার।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে প্রতি বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। চলতি অর্থবছরে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য থাকলেও ২০৩০-৩১ অর্থবছরে তা সাড়ে ৮ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে তা ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। গত জুলাইয়ে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।

জিইডির পরিকল্পনায় অর্থনীতির রূপান্তরের জন্য পাঁচ বছরকে তিন ধাপে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম বছরকে ‘পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতার বছর’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ সময়ে বিনিময় হার স্থিতিশীল করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতির উন্নতির মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

প্রথম থেকে তৃতীয় বছরকে ‘পুনঃস্থাপনের বছর’ হিসেবে ধরা হয়েছে। এ সময়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং চাপের মধ্যে থাকা ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর তৃতীয় থেকে পঞ্চম বছরকে ‘পুনর্গঠন ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর বছর’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পর্যায়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতিকে দ্রুত প্রবৃদ্ধির পথে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

ব্যাংক খাতে বড় সংস্কার

ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ আদায়, তদারকি জোরদার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে পাঁচ বছর মেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনায় তিন ধাপে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। প্রথম বছরে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক, খেলাপি ঋণ ও আমানতকারীদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

পরবর্তী দুই বছরে ব্যাংকের সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ আদায়ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে। শেষ ধাপে ব্যাংকগুলোকে আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করার পাশাপাশি আর্থিক খাতের সামগ্রিক ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ ছাড়া ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও তথ্যব্যবস্থা উন্নত করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনাগত স্বাধীনতা বাড়াতে আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্য

রাজস্ব খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব আদায় বিভাগ আলাদা করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি একক ভ্যাট হার চালু, করছাড় কমানো, অনানুষ্ঠানিক খাতকে করের আওতায় আনা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে কর প্রদান সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

২০৩০-৩১ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

যোগাযোগ অবকাঠামোয় অগ্রাধিকার

আগামী পাঁচ বছরে যোগাযোগ ও পরিবহন খাতেও বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা-লাকসাম-ফেনী কর্ডলাইন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত ও বিদ্যুতায়ন, ঢাকা-পঞ্চগড় এবং ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে ডাবল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত রেল সংযোগের উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে মেট্রোরেল, এলিভেটেড রেল, কমিউটার রেললাইন ও মনোরেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

তরুণদের কর্মসংস্থানে উদ্যোগ

উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ৫৬০ জন তরুণকে স্টার্টআপ ফান্ড থেকে অর্থ সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবছর ১ হাজার ২০০ নারী উদ্যোক্তাকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সুশাসনকে সংস্কারের ভিত্তি

অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে সুশাসনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জিইডির প্রতিবেদনে। সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থাপনা, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্যকর সুশাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, কার্যকর রাজস্ব ও মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো সহজ হবে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, লক্ষ্যগুলো উচ্চাভিলাষী হলেও এগুলো অর্জনে খাতভিত্তিক বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা প্রয়োজন। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, করব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে কার্যকর সংস্কার ছাড়া নির্ধারিত প্রবৃদ্ধি ও আয় অর্জন কঠিন হতে পারে।