এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের প্রায় ৭৫ শতাংশই চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বা লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই ব্যাংকটিতে বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগ্য প্রার্থীরা আবেদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ওই সাত বছরে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ পাওয়া ১০ হাজার ৮৯৯ জন কর্মীর মধ্যে ৮ হাজার ৯৯ জন, অর্থাৎ ৭৪ দশমিক ৭৭ শতাংশই চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়োগ হয়েছে পটিয়া উপজেলার বাসিন্দাদের। মোট নিয়োগের ৪৭ দশমিক ৫০ শতাংশ বা ৫ হাজার ১৪৮ জনই পটিয়ার। চট্টগ্রাম থেকে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের মধ্যে এ হার ৬৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমের বাড়িও চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করাই এ ধরনের আঞ্চলিক আধিপত্য তৈরির অন্যতম কারণ। নিয়মিত নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে দেশের বিভিন্ন এলাকার যোগ্য প্রার্থীরা আবেদন করার সুযোগ পেতেন। কিন্তু বিজ্ঞপ্তি না থাকায় সেই সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, প্রতিবেদনটির বিষয়ে তিনি এখনো অবগত নন। তবে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
নিয়োগে ছিল না বিজ্ঞপ্তি, ছিল সিভি সংগ্রহের বাক্স
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন নিয়োগ প্রক্রিয়ার বেশ কিছু ব্যতিক্রমী তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়ার বাসভবন এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জের অফিসে ‘সিভি সংগ্রহ বাক্স’ রাখা হতো। আগ্রহীদের কাছ থেকে এসব বাক্সে জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করা হতো।
বাক্সগুলোও বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা ছিল। এর মধ্যে ছিল পটিয়া জেনারেল, পটিয়া ক্যাশ, পুরুষ জেনারেল/ক্যাশ, সাতকানিয়া-লোহাগাড়া, গণ্ডামারা-বাঁশখালী, হিন্দু জেনারেল, নারী ক্যাশ এবং পিয়ন/ডিপ্লোমা পদসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরি।
২০১৯ সালে কোনো পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি না দিয়েই ইসলামী ব্যাংকের ২৪তম প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচে ১৭৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এটিকে ব্যাংকের নিজস্ব মানবসম্পদ নীতি ও নির্ধারিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে ২৩তম থেকে ২৬তম ব্যাচের প্রবেশনারি কর্মকর্তাদের সরাসরি নিয়োগের তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে।
ব্যাংকের নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পাওয়ার শর্তও ছিল। পাশাপাশি নিয়োগের অন্তত ১৫ দিন আগে দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বিধান ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসব নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি।
১৭৮ জন নিয়োগের পর ১২৬ জনকে অন্য ব্যাংকে পাঠানোর নির্দেশ
২০১৯ সালের মে মাসে ইসলামী ব্যাংক ১৭৮ জনকে নিয়োগপত্র দেয়। পরে একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকলিপির মাধ্যমে তাদের মধ্যে ১২৬ জনকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংক কোনো জনশক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নয়। ফলে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার ব্যাংকটির ছিল না।
প্রতিবেদনে আরও কয়েকজন ডিএমডির নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। মো. আকিজ উদ্দিন ও মিফতাহ উদ্দিনের ক্ষেত্রে নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ব অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ না করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৭ সালের পর ব্যাংকের নিয়োগসংক্রান্ত নীতিমালায় যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছিল, সেগুলোর কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল বলেও প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
৫ হাজারের বেশি কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইসলামী ব্যাংক ৫ হাজার ৩৮৫ কর্মকর্তার জন্য বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা আয়োজন করে। এসব কর্মকর্তার নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ ছিল।
তবে তারা পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের চাকরিচ্যুত করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর কোনো পরীক্ষা ছাড়াই এবং ভুয়া সনদপত্র ব্যবহারের মাধ্যমে এসব কর্মকর্তার একটি অংশকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। আগের পর্ষদে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাব ছিল।
ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পর্ষদের অডিটে দেখা যায়, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে ব্যাংকটিতে ১০ হাজারের বেশি কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে ব্যাংকটির মোট কর্মীর সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার।
দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় বৈষম্যের অভিযোগ
নিয়োগের পর কর্মকর্তাদের মূল্যায়নেও বৈষম্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে। একই ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে অভিন্ন মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্দিষ্ট সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা আয়োজন করা হলেও ১৭ জনকে কোনো পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই চাকরিচ্যুত করা হয়। অন্যদিকে আরও ২৪৩ কর্মকর্তা ওই পরীক্ষায় অংশ না নিলেও তাদের চাকরি বহাল রাখা হয়।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এর পেছনে বিদেশে পোস্টিং, অসুস্থতা ও মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো কারণ উল্লেখ করেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, কেউ কেউ অব্যাহতির আবেদন না করেও চাকরিতে বহাল ছিলেন। আবার আবেদন করার পরও কিছু কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
বর্তমান ব্যবস্থাপনার বক্তব্য
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তবে কর্মকর্তাদের শুধু নিয়োগ বৈধ বা অবৈধ—এই বিবেচনায় চাকরিচ্যুত করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
তার ভাষ্য, তৎকালীন নিয়োগ প্রক্রিয়া ব্যাংকের চাকরির বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তাই সংশ্লিষ্টদের একটি পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা পরীক্ষায় অংশ নেননি এবং অন্যদেরও পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধা দিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
আলতাফ হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাংকের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করায় শেষ পর্যন্ত তাদের নিয়োগ বাতিল করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকও বিষয়টিকে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখেছে বলে তিনি জানান।
ওই সময় মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্বে থাকা ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামাল উদ্দিন জসিম বলেন, যারা নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তাদের পরবর্তীতে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতি নিয়ে ইসলামী ব্যাংকের সামনে বর্তমানে দুটি পক্ষ পৃথকভাবে আন্দোলন করছে। চাকরি হারানো সাবেক কর্মীরা পুনর্বহালের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন। অন্যদিকে ‘ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক সমন্বয় পরিষদ’ নামে একটি পক্ষ এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমের গ্রেপ্তার, ব্যাংক থেকে লুট হওয়া সম্পদ উদ্ধারের পাশাপাশি বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আন্দোলন করছে।
























