ঢাকা   শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

পর্ষদ-এমডি ছাড়াই চলছে ইসলামী ব্যাংক, থমকে বড় সিদ্ধান্ত

অর্থ ও বাণিজ্য

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭:৩৪, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পর্ষদ-এমডি ছাড়াই চলছে ইসলামী ব্যাংক, থমকে বড় সিদ্ধান্ত

নতুন পর্ষদ গঠনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ধীরগতিতে নেতৃত্বহীনতায় পড়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ না থাকায় ব্যাংকটির গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে এমডি পদও শূন্য থাকায় শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বে তৈরি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা।

গত জুন থেকে ইসলামী ব্যাংকের কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ নেই। এর আগে গত এপ্রিলে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. ওমর ফারুক খানকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। এরপর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব দেওয়া হলেও ব্যাংকটি এখনো পূর্ণাঙ্গ এমডি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদের দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জহির হোসেন মূলত দৈনন্দিন ও রুটিন কার্যক্রমের সিদ্ধান্তই নিচ্ছেন। বড় ধরনের বা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তার কার্যক্রম সীমিত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মকর্তারা জানান, পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব কার্যত একজনের ওপর কেন্দ্রীভূত হওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অনেকটাই ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা বা একাধিক দিক পর্যালোচনার সুযোগ থাকছে না।

এ বিষয়ে জহির হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি ইসলামী ব্যাংকে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। তবে ব্যাংকটিতে পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ কবে গঠন করা হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো সময়সীমা জানেন না।

ভারপ্রাপ্ত এমডি মো. আলতাফ হোসেন জানান, প্রচলিত নিয়মে কোনো ব্যাংক সাধারণত তিন মাসের বেশি সময় এমডি ছাড়া চলতে পারে না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত বিশেষ বিবেচনায় ইসলামী ব্যাংককে এমডি ছাড়াই কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নতুন পর্ষদ কবে আসবে, সে বিষয়েও তার কাছে কোনো তথ্য নেই।

একসময় দেশের ভালো ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকিং বিধিবিধান উপেক্ষা করে গ্রুপটি ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশ নিজেদের নামে নিয়ে নেয়।

চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশই তখন খেলাপি ছিল। এ সময়ে ব্যাংকিং খাতে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের রেকর্ডও ছিল ইসলামী ব্যাংকের।

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংককে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে আনা হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ব্যাংকটির কার্যক্রম চলছে।

এদিকে ব্যাংকটির বড় ঋণ বিতরণেও সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড সুবিধা মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে ব্যাংকটির।

ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হোসেন বলেন, বড় ধরনের বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত থাকায় ব্যাংকটির বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনও হচ্ছে না। ফলে পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ ছাড়াই আপাতত কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

তবে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান মনে করেন, পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ ছাড়া একটি ব্যাংকের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব নয়। তার মতে, পর্ষদ না থাকলে করপোরেট তদারকি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বাজেট অনুমোদন ও কমপ্লায়েন্স বজায় রাখার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী এ পরিস্থিতি কর্মীদের কর্মস্পৃহা কমানোর পাশাপাশি গ্রাহকদের আস্থাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শীর্ষ কর্মকর্তাদের চাকরি নিয়েও অনিশ্চয়তা

পর্ষদ ও শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতির প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের চাকরির মেয়াদেও। এরই মধ্যে অতিরিক্ত এমডি মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন মজুমদার, ডিএমডি মো. মাহবুব আলম এবং সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট আমিনুর রহমানের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে।

মাহবুব আলম ও আমিনুর রহমান আগে অবসরে গেলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাদের পুনরায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। আগামী অক্টোবরে আরও পাঁচজন ডিএমডির চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। তারা হলেন মাহমুদুর রহমান, মো. রফিকুল ইসলাম, মুহাম্মদ সাঈদ উল্লাহ, কে এম মুনিরুল আলম আল-মামুন এবং মো. মাকসুদুর রহমান।

পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ না থাকায় এসব কর্মকর্তার চুক্তি নবায়ন বা ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। তাদের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য ইসলামী ব্যাংক ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।

ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত একটি যোগ্য ও দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা জরুরি। তাদের ভাষ্য, কার্যকর পর্ষদ গঠন করা গেলে গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কাজের গতি ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পর্ষদ গঠনে সতর্ক বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, আগের পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে বিতর্ক থাকায় নতুন পর্ষদ গঠনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবার বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে।

গত মে মাসে আগের চেয়ারম্যান পদত্যাগ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশিদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের চাপের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে খুরশিদ আলমও ছিলেন।

তার পদত্যাগের পর ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ নামের একটি সংগঠন মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ শুরু করে। এতে ব্যাংকের অভ্যন্তরে অস্থিরতা বাড়ার পাশাপাশি তারল্য সংকটও তীব্র হয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে ১৭ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেয়। এরপরও সংকট পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় গত ১৪ জুন ব্যাংকটির পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, আগের পর্ষদ নিয়ে বিতর্কের অভিজ্ঞতার কারণেই নতুন পর্ষদ গঠনের আগে প্রার্থীদের ব্যাপারে পুরোপুরি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। একটি যোগ্য ও স্বচ্ছ পর্ষদ গঠনের কাজ চলছে এবং শিগগিরই ইসলামী ব্যাংকে নতুন এমডি ও পরিচালনা পর্ষদ নিয়োগ দেওয়া হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।