ঢাকা   বৃহস্পতিবার ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩

খেলাপি ঋণ ও অনিয়মে চাপে ব্যাংক খাত, আর্থিক ঝুঁকিতে ১৫ ব্যাংক

অর্থ ও বাণিজ্য

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৫২, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খেলাপি ঋণ ও অনিয়মে চাপে ব্যাংক খাত, আর্থিক ঝুঁকিতে ১৫ ব্যাংক

খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি, ঋণ জালিয়াতি, অনিয়ম ও অর্থ পাচারের ঘটনায় ব্যাংক খাতের ওপর তৈরি হয়েছে বড় ধরনের আর্থিক চাপ। দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অঙ্কের ঋণ আদায় না হওয়ায় বাড়ছে খেলাপি ঋণ। একই সঙ্গে এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতাও বাড়ছে। কিন্তু আয় ও মুনাফা কমে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক সেই প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে পারছে না। ফলে দুর্বল হচ্ছে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি, তৈরি হচ্ছে আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ।

চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১৫টি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে এত বড় অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতিকে আর্থিক দুর্বলতার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করা না গেলে ভবিষ্যৎ লোকসান মোকাবিলা এবং মূলধন পর্যাপ্ততা ধরে রাখা ব্যাংকগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। তথ্য বলছে, পাঁচটি সরকারি ব্যাংকে সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ৭৮ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়েছে জনতা ব্যাংকের। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা।

সরকারি অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকে এই ঘাটতির পরিমাণ ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি এবং বেসিক ব্যাংকে ৫ হাজার ৪৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ৩৩ কোটি টাকা।

বড় অঙ্কের এই ঘাটতি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়া এবং নতুন করে ঋণের মান অবনতি ঘটায় এসব ব্যাংকের ওপর প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ আরও বাড়ছে।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতিও উদ্বেগমুক্ত নয়। পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০টি বেসরকারি ব্যাংকে মোট প্রভিশন ঘাটতি দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি।

একক ব্যাংক হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে। ব্যাংকটির ঘাটতির পরিমাণ ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক, যার প্রভিশন ঘাটতি ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। আইএফআইসি ব্যাংকের ঘাটতি ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।

এ ছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঘাটতি ১১ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৫ হাজার ৫ কোটি এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ২ হাজার ৯৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৬৪৫ কোটি, এনআরবিসি ব্যাংকের ৮২০ কোটি এবং এনআরবি ব্যাংকের ১৩০ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।

ব্যাংক খাতের এই দুরবস্থার পেছনে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করছে খেলাপি ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এর আগে চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালের জুনের তুলনায় এক বছরের ব্যবধানে এই ঋণ বেড়েছে ৭৬ হাজার ১২৭ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। তবে অনেক ব্যাংকের আয় ও মুনাফা সেই বাড়তি চাপ মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট না হওয়ায় তৈরি হচ্ছে প্রভিশন ঘাটতি।

আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সম্ভাব্য ঋণজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোকে ঋণের মান অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে প্রভিশন রাখতে হয়। কোনো ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে ভবিষ্যতে সেই ঋণ থেকে লোকসান হলে তা সামাল দেওয়ার জন্য আগেই অর্থ আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ফলে ঋণ আদায় না হলেও ব্যাংকের ওপর তৈরি হওয়া আর্থিক ক্ষতির একটি অংশ মোকাবিলার সক্ষমতা থাকে।

কিন্তু প্রভিশন ঘাটতি থাকলে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে মূলধন ঘাটতিতে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ে। এর প্রভাব ব্যাংকের নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা থেকে শুরু করে সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর পড়তে পারে।

ব্যাংক খাতের চলমান সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে অর্থনীতিবিদরা খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিভিন্ন নীতিগত সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করছেন। তাদের মতে, ঋণ পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে কিংবা পুনঃতফসিলসহ বিভিন্ন সুবিধা অতিরিক্ত দেওয়া হলে সময়মতো ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়। জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় ব্যাংক খাতের মৌলিক সমস্যাগুলো এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় শুধু প্রভিশন ঘাটতি পূরণ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। খেলাপি ঋণ তৈরির পেছনে থাকা কারণগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, ঋণ বিতরণে অনিয়ম বন্ধ এবং ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশেষ করে জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ কিংবা বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্তের পাশাপাশি অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে পৌঁছানো ইতোমধ্যে বড় ধরনের সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর সঙ্গে বড় অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতি যুক্ত হওয়ায় দুর্বল ব্যাংকগুলোর ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রধানত তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে—খেলাপি ঋণ আদায় বাড়ানো, অনিয়মের মাধ্যমে নতুন ঋণ বিতরণ বন্ধ করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করা। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংকট আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আর এর প্রভাব ব্যাংক খাতের পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ আমানতকারীদের ওপরও পড়তে পারে।