কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকের দুর্নীতির কারণে কোম্পানি বন্ধ করে দিলে কর্মসংস্থান, ঋণ পরিশোধ ও অর্থনীতিতে ওই প্রতিষ্ঠানের অবদান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই ব্যক্তির অপরাধের বিচার ব্যক্তিগতভাবেই হবে, কিন্তু কোম্পানিকে আইনি সত্তা হিসেবে বিবেচনা করে তার কার্যক্রম চালু রাখার সুযোগ দিতে হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আজ রোববার জাতীয় সংসদে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিলামে না তুলে নতুন করে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
সম্পূরক প্রশ্নে আবদুল হান্নান মাসউদ বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। তিনি উল্লেখ করেন, বড় ঋণখেলাপি হিসেবে পরিচিত এস আলমের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ারকে ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬১ ডলারের এলসি খোলার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাঁর দাবি, এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বর্তমানে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে।
তিনি জানতে চান, এসব ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানকে নিলামে তোলা বা রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়ার পরিবর্তে বিশেষ সুবিধায় ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে সরকার খেলাপিদের উৎসাহিত করছে কি না। পাশাপাশি এ ধরনের পদক্ষেপ বিদেশি ঋণদাতাদের বাংলাদেশে অর্থায়নে নিরুৎসাহিত করবে কি না, সেটিও জানতে চান তিনি।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতি ও আর্থিক খাত পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতি ও আইন রয়েছে। ব্যক্তি এবং কোম্পানিকে একইভাবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক আইন অমান্য করে কাউকে ঋণ দিচ্ছে না বলেও তিনি জানান।
তিনি বলেন, আইনে পুনঃতফসিলের সুযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সেই সুযোগ নিতে পারবে। যে কোম্পানি আইন অনুযায়ী পুনঃতফসিলের যোগ্য, তারা তা করতে পারবে; আর যারা যোগ্য নয়, তারা এ সুবিধা পাবে না।
দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, কারও ব্যক্তিগত দুর্নীতির জন্য তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে, তাকে কারাগারে পাঠানো হতে পারে এবং আইনের সর্বোচ্চ শাস্তিও হতে পারে। তবে কোম্পানি একটি পৃথক আইনি সত্তা। ফলে মালিকের অপরাধের কারণে কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া ঠিক হবে না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি কোম্পানিতে মানুষ কাজ করেন, প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব দায় ও ঋণ থাকে এবং দেশের অর্থনীতিতে তার অবদান থাকে। শুধু কোনো ব্যক্তির কারণে একটি কোম্পানি বন্ধ করে দিলে কর্মসংস্থান নষ্ট হবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এভাবে কোম্পানি বন্ধ করে কোনো দেশের অর্থনীতি পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে এবং ব্যক্তিগত দুর্নীতির জন্য প্রত্যেকের বিচার হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা
জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ব্যাংকগুলো হলো—অগ্রণী, জনতা, রূপালী, সোনালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীমের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকে। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
এ ছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৯ হাজার ২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, রূপালী ব্যাংকের ১৯ হাজার ২৮১ কোটি ৭৪ লাখ, সোনালী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৪৮ কোটি ৩৯ লাখ, বেসিক ব্যাংকের ৮ হাজার ১৩১ কোটি ৯ লাখ এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ৮৮৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
মাথাপিছু সরকারি ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা
কুষ্টিয়া-১ আসনের রেজা আহাম্মেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশের জনগণের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা।
তিনি বলেন, জনগণের ওপর ঋণের চাপ কমাতে সরকার রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি অর্থের দক্ষ ব্যবহার এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারি আয় বাড়িয়ে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন কমানোর পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ব্যয়কে আরও সাশ্রয়ী ও ফলপ্রসূ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া উন্নত নগদ ব্যবস্থাপনা ও বাজারভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা কমানোর চেষ্টা চলছে। দীর্ঘ মেয়াদে এর মাধ্যমে জনগণের ওপর ঋণের বোঝা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
ভর্তুকি একযোগে প্রত্যাহারের নীতি নেই
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের নূরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন-সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ বা অর্থায়ন নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের প্রধান বিবেচনা জাতীয় স্বার্থ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি বা অন্যান্য খাতের সব ধরনের ভর্তুকি একসঙ্গে তুলে দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি।
তিনি জানান, কৃষি, খাদ্য ও বিদ্যুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকবে। উন্নয়ন-সহযোগীদের অর্থায়ন নেওয়ার ক্ষেত্রেও দেশের আর্থিক সক্ষমতা ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
১৪ বছরে আড়াই টনের বেশি স্বর্ণ জব্দ
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মোসা. ফরিদা ইয়াসমিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চোরাচালানিদের কাছ থেকে ২ হাজার ৫১৮ কেজি ৬৬৮ গ্রাম স্বর্ণ এবং ৩৭৭ কেজি ৩৪৮ গ্রাম রৌপ্য জব্দ করা হয়েছে।


















