শেয়ারবাজারে দুর্বল কোম্পানির আইপিও অনুমোদনে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের অভাব এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তালিকাভুক্ত হওয়া টেক্সটাইল কোম্পানিগুলো। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে শেয়ারবাজার থেকে ২ হাজার ২০১ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করা ১৬টি টেক্সটাইল কোম্পানির মধ্যে ১০টির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন হাজারো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী। তালিকাভুক্তির সময় কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও প্রকৃত ব্যবসায়িক অবস্থা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ১৬টি টেক্সটাইল কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে এই অর্থ সংগ্রহ করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের ১০টির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আইপিওর অনুমোদন চাওয়ার সময় কয়েকটি কোম্পানি তাদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা গোপন করেছে কিংবা আর্থিক সক্ষমতার অতিরঞ্জিত চিত্র তুলে ধরেছে। এতে ব্যবসায়িক ভিত্তি দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পুঁজিবাজার থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বক্তব্য এখানে পাওয়া যায়নি।
ডিএসইর ১২ অক্টোবর ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া ৩৭টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে ১৪টিই টেক্সটাইল খাতের। বর্তমানে তালিকাভুক্ত ৫৮টি টেক্সটাইল কোম্পানির মধ্যে ১৪টির কারখানা পুরোপুরি বন্ধ। এ ছাড়া আর্থিক সংকট ও বিভিন্ন অনিয়মের কারণে আরও ২৮টি কোম্পানি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে।
সাধারণত টানা দুই বছর লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হওয়া, নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক সাধারণ সভা বা এজিএম করতে না পারা, ছয় মাসের বেশি সময় কারখানা বন্ধ থাকা কিংবা পরিশোধিত মূলধনের তুলনায় সঞ্চিত লোকসান বেশি হওয়ার মতো কারণে কোম্পানিকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের অভিযোগ, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তালিকাভুক্ত হওয়া বেশ কিছু টেক্সটাইল কোম্পানি বাজারে আসার সময় কাল্পনিক মুনাফা ও অসংগতিপূর্ণ আর্থিক বিবরণী উপস্থাপন করেছিল। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যকর উৎপাদন অবকাঠামো ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। এসব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে টেক্সটাইল খাতের কোম্পানিগুলোর সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে চলতি মূলধনের অভাবে। বন্ধ ও নিষ্ক্রিয় কারখানা পুনরুজ্জীবিত করতে সরকার বিশেষ তহবিলের ঘোষণা দিলেও ব্যাংকের কঠোর শর্ত ও ঋণ দিতে অনীহার কারণে অনেক উদ্যোক্তা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। ফলে উৎপাদন পুনরায় চালু করা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক করার পথ কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক দুর্বল টেক্সটাইল কোম্পানি মূলত শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, তৎকালীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব কোম্পানিকে অনুমোদন দিয়েছিল।
একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন ডিএসইর চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম। সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানান, বিগত সরকারের সময় ডিএসইর আপত্তি এবং কোম্পানিগুলোর দুর্বল আর্থিক বিবরণী নিয়ে সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা কয়েকটি কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির অনুমতি দিয়েছিল। তাঁর মতে, অনিয়মের অভিযোগে থাকা এসব কোম্পানির ধারাবাহিক খারাপ পারফরম্যান্স সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং সামগ্রিক পুঁজিবাজারকে দুর্বল করেছে। তবে আইপিও অনুমোদন ও তালিকাভুক্তির নিয়মে সংস্কার এবং তদারকি বাড়ানোর ফলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে, টেক্সটাইল কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে ব্যবসায়িক সংকটকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) এক কর্মকর্তার ভাষ্য, কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের যন্ত্রাংশের উচ্চমূল্য, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
সব মিলিয়ে, টেক্সটাইল খাতের একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ার ঘটনায় একদিকে যেমন উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি বিনিয়োগকারীদের পুঁজি আটকে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এখন বড় প্রশ্ন—তালিকাভুক্তির সময় কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ে কোথায় ঘাটতি ছিল এবং সেই ব্যর্থতার দায় কে নেবে?
























