গত সপ্তাহের স্বল্পস্থায়ী উত্থান ভারতের শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মনে সাময়িক স্বস্তি আনলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কিছুক্ষণের ব্যবধানেই মুম্বাইয়ের দালাল স্ট্রিটে নেমে আসে তীব্র মন্দা। সোমবারের লেনদেন চলাকালেই ভারতীয় শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা প্রায় ৪ লাখ কোটি রুপি হারিয়েছেন। ব্যাংকিং খাতের শেয়ারে বড় ধরনের পতন, বিদেশি মূলধনের লাগাতার প্রস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের লাগামহীন দাম বৃদ্ধিই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ।
স্থানীয় সময় দুপুর আড়াইটায় দিনের লেনদেন শেষ হওয়ার আগেই বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের বেঞ্চমার্ক সূচক সেনসেক্স এক ধাক্কায় ১ হাজার পয়েন্ট নিচে নেমে যায়। একই সময়ে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক নিফটি ৫০ হারায় ২৯৫ পয়েন্ট। এর ফলে গত দুই দিন ধরে চলা ইতিবাচক ধারার সম্পূর্ণ পতন ঘটে। এই ভয়াবহ ধাক্কা কেবল বড় মূলধনের কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং নিফটি মিডক্যাপ ১০০ এবং নিফটি স্মলক্যাপ ১০০ সূচকেও ব্যাপক দরপতন লক্ষ্য করা গেছে।
গত শুক্রবার বাজার বন্ধের সময় বিএসই-এর তালিকাভুক্ত সমস্ত কোম্পানির মোট বাজারমূল্য যেখানে ছিল ৪ কোটি ৭২ লাখ ৬২ হাজার ১৬৭ কোটি রুপি, সোমবার দুপুর আড়াইটা নাগাদ তা কমে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৬৮ লাখ ১৭ হাজার ১৯৯৫ কোটি রুপিতে। ফলে চোখের পলকেই বিনিয়োগকারীদের পকেট থেকে উধাও হয়ে গেছে প্রায় ৪ লাখ কোটি রুপি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই ভয়াবহ পতনের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ সক্রিয় ছিল, যেগুলো হলো-
১. ব্যাংকিং খাতের বিপুল ধস
সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন বিনিয়োগকারীদের আশাহত করেছে। ফলে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো থেকে ব্যাপকহারে পুঁজি তুলে নেওয়া হয়। এইচডিএফসি ব্যাংক, আইসিআইসিআই ব্যাংক ও অ্যাক্সিস ব্যাংক—এই তিনটি বড় প্রতিষ্ঠান মিলে সেনসেক্সের মোট পতনের অর্ধেকেরও বেশি দায় বহন করেছে। বিশেষ করে এইচডিএফসি ব্যাংকের শেয়ার ৩ শতাংশ এবং আশানুরূপ ফল করতে না পারায় অ্যাক্সিস ব্যাংকের শেয়ার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত দর হারিয়েছে।
২. আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানিসংকট
ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ থেকে ১০৯ ডলারে পৌঁছানো বাজারে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি করেছে। ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ক্ষেত্রে চড়া মূল্যের তেল আমদানির চাপ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
৩. বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পিছু হটা
ভারতীয় বাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মূলধন তুলে নেওয়ার প্রবণতা আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। একা চলতি অক্টোবর মাসেই বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা (এফপিআই) ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ৫২ হাজার ১০০ কোটি রুপি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, যা এই বছরের অন্যতম সর্বোচ্চ রেকর্ড। এর আগের মাস অর্থাৎ সেপ্টেম্বরেও তারা প্রায় ৩৫ হাজার ৮৬১ কোটি রুপি তুলে নিয়েছিলেন।
জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অভিনব ত্রিপাঠীর মতে, ‘আগামী দিনগুলোতে বাজারের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যপ্রবাহ, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিদেশি বিনিয়োগের গতির ওপর।’ তেলের চড়া দাম অব্যাহত থাকলে ভারতে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুতেই কমবে না, যার ফলে এই ধাক্কা কাটিয়ে শেয়ারবাজারের পক্ষে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো অত্যন্ত দুরূহ হবে।
























