ঢাকা   সোমবার ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩

কেয়া কসমেটিকসের ঋণে বিপাকে ৪ ব্যাংক, পাওনা ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:২৪, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

কেয়া কসমেটিকসের ঋণে বিপাকে ৪ ব্যাংক, পাওনা ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডকে বড় অঙ্কের ঋণ দিয়ে চরম আর্থিক ঝুঁকিতে বা বেকায়দায় পড়েছে শেয়ারবাজারেরই চার বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। অনারোপিত সুদসহ এই ব্যাংকগুলোর কাছে কেয়া গ্রুপের মোট পাওনা ছাড়িয়ে গেছে তিন হাজার কোটি টাকা। সংকটে পড়া ব্যাংকগুলো হলো—সাউথইস্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এই ব্যাংকগুলোর কাছে বন্ধক বা মর্টগেজ রাখা সম্পত্তির পরিমাণ ঋণের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। যেমন—সাউথইস্ট ব্যাংকের কাছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ঋণ বিপরীতে মর্টগেজ সম্পত্তির বাজারমূল্য মাত্র পৌনে তিনশ কোটি টাকা। একইভাবে ন্যাশনাল ব্যাংকের সাড়ে সাতশ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তির মূল্য দুইশ কোটি টাকারও কম। এছাড়া পূবালী ব্যাংকের সোয়া পাঁচশ কোটি টাকার বিপরীতে মাত্র দেড়শ কোটি টাকার সম্পত্তি এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক থেকে প্রায় একশ কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোর আশঙ্কা, এই বিশাল ঋণ আদায় করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে তাদের।


অনুসন্ধানে জানা যায়, কেয়া কসমেটিকস ব্যাংক থেকে যে পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করেছে, তার বিপরীতে জামানত বা মর্টগেজ রাখা সম্পত্তির মোট বাজারমূল্য ৩০ শতাংশেরও অনেক কম। এর ওপর আবার ব্যাংকগুলোর ঋণ পরিশোধ না করার অসৎ উদ্দেশ্যে টালবাহানা শুরু করেছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবদুল খালেক পাঠান। কেয়া গ্রুপের পক্ষ থেকে মনগড়া ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে দাবি করা হচ্ছে যে, তাদের রপ্তানি আয় ঋণদাতা ব্যাংকগুলো নির্দিষ্ট এফসি (বৈদেশিক মুদ্রা) হিসাবে জমা করেনি। এই পুরো ঘটনাটি যেন দেশের আলোচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারির কথাই পুনরায় মনে করিয়ে দেয়।

ব্যাংকগুলোর নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, ঋণের দায় এড়াতে এবং আইনি ঝামেলা থেকে বাঁচতে নানা রকম নয়ছয় করে চলেছেন কেয়া গ্রুপের প্রধান। ব্যাংকের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ এনে একের পর এক চিঠি দিয়ে যাচ্ছেন তারা। যদিও ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে যে, রপ্তানি আয় জমা হয়নি মর্মে কেয়া গ্রুপের করা অভিযোগের সপক্ষে তারা সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা প্রমাণ দিতে পারছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, কেয়া গ্রুপের চেয়ারম্যানের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মূলত ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হওয়ার মতলবেই এমন কাল্পনিক অভিযোগ তোলা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কেয়া কসমেটিকসকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করে একটি ব্যাংক চিঠিও ইস্যু করেছে। পাশাপাশি পাওনা টাকা উদ্ধারের জন্য ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে অর্থঋণ আদালতে এবং সিআর মামলা দায়ের করা হয়েছে, যা বর্তমানে চলমান রয়েছে।

কেয়া গ্রুপের এই অনিয়মের অভিযোগ আমলে নিয়ে পরবর্তীতে মাঠে নামে খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শেষে সেই প্রতিবেদন দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয় এবং বর্তমানে দুদকের একজন উপপরিচালক বিষয়টি নিয়ে নিবিড় তদন্ত করছেন। দুদক সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই তদন্তে কেয়া গ্রুপের করা রপ্তানি আয় আত্মসাৎ বা জমা না হওয়ার অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।


কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে কেয়া কসমেটিকস ও এর চেয়ারম্যানকে সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আবদুল খালেক পাঠান অত্যন্ত সুকৌশলে অর্জিত রপ্তানি আয় অন্যত্র পাচার বা স্থানান্তর করেছেন। এমনকি এই পুরো প্রক্রিয়ার সাথে মানিলন্ডারিংয়ের গুরুতর বিষয়ও জড়িত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

দুদক ও ব্যাংক সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত তথ্যে দেখা যায়, সাউথইস্ট ব্যাংক গুলশান শাখা, পূবালী ব্যাংক প্রিন্সিপাল শাখা, ন্যাশনাল ব্যাংক গুলশান শাখা এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক গুলশান শাখা থেকে কেয়া গ্রুপের অনুকূলে আসা রপ্তানি আয় সঠিকভাবে প্রত্যাবাসিত হয়েছিল। তবে সেই আয় থেকে ইমপোর্ট পেমেন্টের দায়, বিভিন্ন ব্যাংকিং চার্জ, উৎসে কর, ভ্যাট এবং এআইটি পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থ নিয়ম অনুযায়ী গ্রাহকের হিসাবে সমন্বয় করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দীর্ঘ মেয়াদের পরিদর্শনে দেখা গেছে, সাউথইস্ট ব্যাংক গুলশান শাখা থেকে ২০০৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৮ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকার রপ্তানি আয় আসে, যার বড় অংশ ইমপোর্ট পেমেন্ট ও সুদ বাবদ খরচ হয়ে গ্রাহকের চলতি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। একইভাবে পূবালী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা থেকে প্রায় ৭২২ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ২৭০ লাখ মার্কিন ডলার এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক থেকে ৬০ কোটির বেশি টাকার রপ্তানি আয় নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন ঋণ ও এলসি দায় সমন্বয় করে বাকি অর্থ কেয়া গ্রুপের হিসাবে জমা দেওয়া হয়েছে।

পরিশেষে, বাংলাদেশ ব্যাংকের চূড়ান্ত তদন্ত ও পর্যালোচনায় এটিই প্রমাণিত হয়েছে যে, কেয়া কসমেটিকস গ্রুপ ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে যে বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব বা রপ্তানি আয় জমা না হওয়ার মিথ্যা অভিযোগ তুলেছে, তার কোনো আইনগত ভিত্তি বা সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সর্বশেষ