শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের দাম ৪৪ থেকে ৮১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিনিয়োগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএএল বাংলাদেশ। ব্যাংক খাতে সংস্কারের ফলে আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ বিতরণ বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারে। এতে এসব ব্যাংকের আয় ও ব্যবসা বাড়তে পারে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
সিএএল বাংলাদেশের পছন্দের তালিকায় রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক। ‘ব্যাংকিং অন দ্য নেক্সট সাইকেল’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে ব্যাংকগুলোর সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ৫ অক্টোবরের শেয়ারদর বিবেচনায় পাঁচ ব্যাংকের সম্ভাব্য লক্ষ্যদর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারে সবচেয়ে বেশি, ৮০ দশমিক ৭ শতাংশ দরবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে প্রতিষ্ঠানটি। অন্য চার ব্যাংকের শেয়ারেও ৪৪ থেকে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত দরবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে এ হিসাবে নগদ লভ্যাংশ থেকে সম্ভাব্য আয় ধরা হয়নি।
পাঁচ ব্যাংকের সম্ভাব্য লক্ষ্যদর
সিএএল বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী, ৫ অক্টোবর ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারদর ছিল ৬৫ টাকা। ব্যাংকটির সম্ভাব্য লক্ষ্যদর নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৭ টাকা ৪৫ পয়সা। এতে দরবৃদ্ধির সম্ভাবনা ৮০ দশমিক ৭ শতাংশ।
একই দিনে সিটি ব্যাংকের শেয়ারদর ছিল ২৯ টাকা ৭০ পয়সা। ব্যাংকটির লক্ষ্যদর ৪৮ টাকা ৩৬ পয়সা। এতে সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৬২ দশমিক ৮ শতাংশ।
ইস্টার্ন ব্যাংকের শেয়ারদর ছিল ২২ টাকা ৮০ পয়সা। এর লক্ষ্যদর নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ টাকা ৩৮ পয়সা। অর্থাৎ দরবৃদ্ধির সম্ভাবনা ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের শেয়ারদর ছিল ৪৫ টাকা ৫০ পয়সা। ব্যাংকটির সম্ভাব্য লক্ষ্যদর ৬৭ টাকা ২৫ পয়সা। এতে দরবৃদ্ধির সম্ভাবনা ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, পূবালী ব্যাংকের শেয়ারদর ছিল ৩৮ টাকা ৮০ পয়সা। এর লক্ষ্যদর নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ টাকা ৮৮ পয়সা। এতে সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৪৪ শতাংশ।
কেন এগিয়ে থাকতে পারে ব্যাংকগুলো
সিএএল বাংলাদেশের মতে, ব্যাংক খাতে কঠোর নিয়ম চালু হওয়ায় দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক সমস্যা সামনে আসছে। এতে ভালো মূলধন ও তুলনামূলক কম খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকগুলো বেশি আমানত সংগ্রহ এবং ঋণ বিতরণের সুযোগ পেতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি ছিল ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। সংকটে থাকা ১০টি ব্যাংকের কাছে ছিল মোট খেলাপি ঋণের ৭৪ শতাংশ।
এর বিপরীতে, গবেষণায় ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত হিসেবে চিহ্নিত ১৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের মধ্যম হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন পর্যাপ্ততার হার ছিল ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ। গবেষণায় ব্যবহৃত ১২ দশমিক ৫ শতাংশের মানদণ্ডের চেয়ে এ হার বেশি।
এই ১৪টি ব্যাংকের হাতে মানদণ্ডের অতিরিক্ত ১৬ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার মূলধন রয়েছে। ঋণের চাহিদা বাড়লে এই অর্থ ঋণ বিতরণ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে বলে মনে করছে সিএএল বাংলাদেশ।
বাড়তে পারে বেসরকারি খাতে ঋণ
সিএএল বাংলাদেশের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৮-২৯ অর্থবছরে তা বেড়ে ১২ শতাংশ হতে পারে।
এতে ২০২৬ সালের জুনের তুলনায় বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। এই অতিরিক্ত ঋণের ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ আসতে পারে গবেষণায় চিহ্নিত ১৪টি ব্যাংক থেকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম দিকে ব্যক্তিগত ঋণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অর্থায়ন, ভোক্তা ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়তে পারে। পরে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ, আমদানি অর্থায়ন ও বাণিজ্যিক লেনদেনেও গতি আসতে পারে।
ব্যাংকভিত্তিক বিশ্লেষণে সিএএল বাংলাদেশ বলেছে, ব্র্যাক ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে শক্তিশালী অবস্থান এবং বিকাশে অংশীদারত্ব ব্যাংকটির ব্যবসা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
সিটি ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড, পেমেন্ট ও খুচরা ব্যাংকিং ব্যবসার মাধ্যমে লাভবান হতে পারে। ইস্টার্ন ব্যাংকের ঋণের বিপরীতে প্রভিশন এবং লেনদেনভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রমকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।
পূবালী ব্যাংকের দেশজুড়ে শাখা নেটওয়ার্ক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক ঋণ বিতরণ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। আর ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কম খরচের আমানত ও বিস্তৃত নেটওয়ার্ক নতুন ঋণ বিতরণের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ব্যাংক খাতে ঝুঁকিও রয়েছে
তবে ব্যাংকগুলোর সামনে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে বলে সতর্ক করেছে সিএএল বাংলাদেশ। দুর্বল ব্যাংকের সংকট অন্য ব্যাংকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবার ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধানের ওপর সীমা থাকায় ব্যাংকগুলোর আয় কমতে পারে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি লোকসান করেছে। এ ছাড়া ১৯টি ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার হার আইনগত ন্যূনতম সীমার নিচে ছিল।
ঋণ ও আমানতের ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নিয়মও ব্যাংকগুলোর আয়ে চাপ তৈরি করতে পারে। সিএএল বাংলাদেশের হিসাবে, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৫৫টি ব্যাংকের এ ব্যবধান নির্ধারিত সীমার ওপরে ছিল। এর মধ্যে গবেষণায় ভালো অবস্থানে থাকা ১৪টি ব্যাংকের ১৩টিও রয়েছে।
বড় করপোরেট ঋণগ্রহীতাদের কাছে অতিরিক্ত ঋণ কেন্দ্রীভূত থাকাও ঝুঁকি। কোনো বড় ঋণ পুনর্গঠন বা নতুন করে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হলে ব্যাংককে অতিরিক্ত অর্থ প্রভিশন হিসেবে রাখতে হতে পারে। এতে ব্যাংকের মুনাফা ও আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ পড়তে পারে।
সব ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েও সিএএল বাংলাদেশ মনে করছে, আলোচনায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের মূল্যায়ন আকর্ষণীয়। তবে পূর্বাভাস অনুযায়ী শেয়ারের দাম বাড়বে কি না, তা নির্ভর করবে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, ঋণের চাহিদা এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতার ওপর।
উল্লেখ্য, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া লক্ষ্যদর একটি পূর্বাভাস মাত্র। এটি শেয়ারের দাম বাড়ার নিশ্চয়তা নয়।
























