ঢাকা   বুধবার ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

৪০ হাজার কোটি ঋণের চাপ, বেক্সিমকোর বন্ধ কারখানা খুলতে ২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৩৪, ৭ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

৪০ হাজার কোটি ঋণের চাপ, বেক্সিমকোর বন্ধ কারখানা খুলতে ২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বেক্সিমকো গ্রুপের কারখানায় আবারও উৎপাদন শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংক ঋণের বড় বোঝার মধ্যেই গাজীপুরের কাশিমপুরে বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের একটি পোশাক কারখানা নতুন ব্যবসায়িক মডেলে চালু করতে ব্রিটিশ ও চীনা দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোট ২ কোটি ৩০ লাখ ডলার বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে। প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন পাওয়া গেলে আগামী বছরের এপ্রিলেই কারখানাটিতে উৎপাদন শুরু হতে পারে।

বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে বন্ধ থাকা ১৬টি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল ইউনিটের মধ্যে প্রথমে প্রিফিক্স ফ্যাশনস লিমিটেড চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ উদ্যোগ সফল হলে একই মডেলে পর্যায়ক্রমে বাকি কারখানাগুলোও চালুর পথ তৈরি হতে পারে।

রপ্তানি আয় থেকে সরাসরি ঋণ পরিশোধ

প্রস্তাবিত এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কারখানার উৎপাদন ও রপ্তানি আয় ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো তৈরি করা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেক্সিমকো গ্রুপের সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য লিজ বা চুক্তিতে যাবে। কারখানায় উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে যে অর্থ আয় হবে, তা সরাসরি নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা হবে।

এরপর যেসব ব্যাংকের ঋণের বিপরীতে লিয়েন রয়েছে, সেসব ব্যাংক স্বয়ংক্রিয়ভাবে রপ্তানি আয় থেকে ঋণের কিস্তি কেটে নেবে। ফলে ঋণ পরিশোধের অর্থ ব্যবস্থাপনায় বেক্সিমকো গ্রুপের সরাসরি হস্তক্ষেপ থাকবে না।

উদ্যোক্তাদের ধারণা, এ ব্যবস্থায় একদিকে কারখানার উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধেও ধারাবাহিকতা তৈরি হবে।

বিনিয়োগ করবে ব্রিটিশ ও চীনা প্রতিষ্ঠান

প্রস্তাবিত ২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বিনিয়োগে অর্থায়ন করবে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান চার্টার এইচসিপি লিমিটেড এবং চীনা প্রতিষ্ঠান বেস্টিং লিমিটেড।

পুরো উদ্যোগে অ্যাসেট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছে জাপানি-বাংলাদেশি যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান রিভাইভাল গ্লোবাল।

প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের আগে সরকারের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হবে। এ নিয়ে আগামী ১১ অক্টোবর বিনিয়োগ সুবিধা প্রদানকারী শীর্ষ সংস্থা ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-এর চেয়ারম্যানের সঙ্গে বেক্সিমকো ও রিভাইভাল গ্লোবালের কর্মকর্তাদের বৈঠকের কথা রয়েছে।

এরপর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে কারখানা চালুর প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

প্রথম ধাপে কর্মসংস্থান হবে ২ হাজার ৫০০ শ্রমিকের

প্রিফিক্স ফ্যাশনস চালু হলে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।

কারখানাটিতে উৎপাদিত পোশাকের বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করার পরিকল্পনা রয়েছে। মোট উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ জ্যাকেট হবে বলে প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, উৎপাদন শুরু হওয়ার পরবর্তী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে কারখানাটি থেকে প্রায় ৫০ কোটি ডলার বা ৫০০ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

একটি কারখানা সফল হলেই খুলতে পারে বাকি ১৫ ইউনিট

প্রিফিক্স ফ্যাশনসের মাধ্যমে নেওয়া উদ্যোগটি সফল হলে এটিকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করে বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের বাকি ১৫টি বন্ধ ইউনিটও পর্যায়ক্রমে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

এটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা কারখানাগুলোতে আবার উৎপাদন শুরু হওয়ার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান ফিরে আসতে পারে।

কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার পর ৩০ হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। ফলে একটি কারখানা দিয়ে শুরু হওয়া উদ্যোগটি সফল হলে পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর পরিসরে কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কেন বন্ধ হয়েছিল বেক্সিমকোর কারখানা?

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটি সমস্যায় পড়লে ২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকার কারখানাগুলো বন্ধ ঘোষণা করে।

এর আগে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য সরকার ৫২৬ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল।

এদিকে বেক্সিমকো গ্রুপের মালিকানার সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান যুক্ত। বর্তমানে তিনি কারাবন্দী রয়েছেন।

৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যাংক ঋণ

বেক্সিমকোর কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগটি এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন গ্রুপটির ওপর রয়েছে বিপুল ব্যাংক ঋণের চাপ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেক্সিমকো গ্রুপের মোট ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে শুধু গাজীপুরের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ৩২টি কারখানার বিপরীতে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৯ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।

এই ঋণের সবচেয়ে বড় অংশ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের কাছে। ব্যাংকটির পাওনা প্রায় ২৩ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা।

ফলে বন্ধ কারখানা চালু করে উৎপাদন ও রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংক ঋণ পরিশোধের একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করাই এখন এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

ঋণের বোঝার মধ্যেও নতুন সম্ভাবনা

সব মিলিয়ে, বেক্সিমকোর বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর এই উদ্যোগ শুধু একটি কারখানা সচল করার পরিকল্পনা নয়; বরং উৎপাদন, রপ্তানি ও ব্যাংক ঋণ পরিশোধকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার একটি নতুন মডেল।

প্রথম ধাপে প্রিফিক্স ফ্যাশনস চালু করে যদি উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনা করা যায়, তাহলে একই কাঠামোয় বাকি ১৫টি বন্ধ ইউনিট চালুর সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

তবে পুরো পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নির্ভর করছে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন, বিদেশি বিনিয়োগের বাস্তবায়ন এবং প্রস্তাবিত ব্যবসায়িক মডেল কার্যকরভাবে পরিচালনার ওপর। আগামী ১১ অক্টোবরের বৈঠক এবং পরবর্তী সময়ে বিডা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়ার পরই উদ্যোগটির বাস্তব অগ্রগতি আরও স্পষ্ট হবে।

সর্বশেষ