মাত্র নয় মাসেই আগের পুরো অর্থবছরের প্রায় সমান শেয়ারপ্রতি আয় করেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসি। একই সঙ্গে বেড়েছে পরিচালন নগদ প্রবাহ ও শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি)। আয়, নগদ প্রবাহ ও সম্পদমূল্য—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকেই ধারাবাহিক উন্নতির কারণে চলতি অর্থবছর শেষে আগের বছরের ৪০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশের সমান বা তার চেয়ে বেশি ডিভিডেন্ড দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হতে পারে কোম্পানিটির।
তবে সম্ভাব্য ডিভিডেন্ড নিয়ে এখনই নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। আগামী ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য পরিচালনা পর্ষদের সভায় ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনার পরই ডিভিডেন্ডের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে।
নয় মাসে ইপিএস ১০ টাকা ৫৭ পয়সা
বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলসের সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে কোম্পানিটির পরিশোধিত শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস দাঁড়িয়েছে ১০ টাকা ৫৭ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এই ইপিএস ছিল ৬ টাকা ৮৩ পয়সা।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নয় মাসের ইপিএস বেড়েছে ৩ টাকা ৭৪ পয়সা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পুরো বছরে কোম্পানিটির মৌলিক ইপিএস ছিল ১১ টাকা ১ পয়সা। ফলে চলতি অর্থবছরের মাত্র নয় মাসেই আগের পুরো বছরের ইপিএসের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে কোম্পানিটি।
নয় মাসে পরিচালন নগদ প্রবাহ বা এনওসিএফপিএসও বেড়েছে। এ সময়ে এনওসিএফপিএস হয়েছে ৯ টাকা ৭৬ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭ টাকা ৮৩ পয়সা।
একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বা এনএভি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৮ টাকা ৭১ পয়সায়। ২০২৫ সালের ৩০ জুনে কোম্পানিটির এনএভি ছিল ৯০ টাকা ৯৯ পয়সা। অর্থাৎ নয় মাসে শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য বেড়েছে ৭ টাকা ৭২ পয়সা।
তিন প্রান্তিকেই আয় বৃদ্ধির ধারা
কোম্পানিটির আর্থিক উন্নতি শুধু তৃতীয় প্রান্তিকের ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। চলতি অর্থবছরের প্রতিটি প্রান্তিকেই আগের বছরের তুলনায় ইপিএস বৃদ্ধির ধারা দেখা গেছে।
২০২৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে কোম্পানিটির মৌলিক ইপিএস ছিল ৩ টাকা ৬৭ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ টাকা ৫৪ পয়সা। ওই প্রান্তিকে পরিচালন নগদ প্রবাহও বেড়ে ২ টাকা ৪৭ পয়সায় দাঁড়ায়, যা আগের বছর ছিল ১ টাকা ৭১ পয়সা।
এরপর অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে মৌলিক ইপিএস আরও বেড়ে ৪ টাকা ১৭ পয়সায় পৌঁছে। আগের বছরের একই সময়ে এই ইপিএস ছিল ২ টাকা ৩২ পয়সা। ফলে প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটির মৌলিক ইপিএস দাঁড়ায় ৭ টাকা ৮৪ পয়সা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪ টাকা ৯৩ পয়সা।
ছয় মাসে পরিশোধিত ইপিএসও বেড়ে ৭ টাকা ৭ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৪ টাকা ৫২ পয়সা। একই সময়ে এনওসিএফপিএস হয়েছে ৬ টাকা ৪৭ পয়সা, যা আগের বছর ছিল ৪ টাকা ৭৩ পয়সা।
জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ প্রান্তিকে পরিশোধিত ইপিএস হয়েছে ৩ টাকা ৪৯ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এটি ছিল ২ টাকা ৩৩ পয়সা। ফলে নয় মাসের ইপিএস ১০ টাকা ৫৭ পয়সায় পৌঁছেছে।
ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রমেই আয় বাড়ছে
আর্থিক ফলাফলে উন্নতির কারণ হিসেবে কোম্পানিটি ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম থেকে রাজস্ব ও অন্যান্য আয় বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে। কোম্পানির প্রকাশিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আয় ও অন্যান্য ব্যাপক আয়সংক্রান্ত বিবরণীর রাজস্ব অংশের ৩৩ থেকে ৩৭ নম্বর নোটে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে।
কোম্পানিটি আরও জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট সময়ে উল্লেখযোগ্য কোনো অস্বাভাবিক বা বিশেষ লেনদেন হয়নি। ফলে ইপিএস বৃদ্ধিকে মূল ব্যবসার কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত বলেই উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
পরিচালন নগদ প্রবাহ ও শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রমকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৪০% ক্যাশ ডিভিডেন্ড এবার ছাড়িয়ে যাবে?
বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন ডিভিডেন্ড নিয়ে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির মৌলিক ইপিএস ছিল ১১ টাকা ১ পয়সা এবং এনএভি ছিল ৯০ টাকা ৯৯ পয়সা। ওই বছর পরিচালনা পর্ষদ ৪০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। অর্থাৎ প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ৪ টাকা নগদ লভ্যাংশ।
চলতি অর্থবছরের চিত্র আগের বছরের তুলনায় আরও শক্তিশালী। নয় মাসেই পরিশোধিত ইপিএস ১০ টাকা ৫৭ পয়সায় পৌঁছেছে, যা আগের পুরো বছরের ১১ টাকা ১ পয়সার প্রায় সমান। পাশাপাশি এনএভি ৯০ টাকা ৯৯ পয়সা থেকে বেড়ে ৯৮ টাকা ৭১ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।
এই ধারা অর্থবছরের শেষ তিন মাসেও বজায় থাকলে পুরো বছরের আয় আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে আগের ৪০ শতাংশের সমান বা তার চেয়ে বেশি নগদ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ৪৫ শতাংশ বা ৫০ শতাংশ ডিভিডেন্ডের মতো কোনো নির্দিষ্ট হার এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে, ৪৫ শতাংশ ডিভিডেন্ড হলে শেয়ারপ্রতি ৪ টাকা ৫০ পয়সা এবং ৫০ শতাংশ হলে ৫ টাকা নগদ লভ্যাংশ হয়—এগুলো কেবল হিসাবভিত্তিক সম্ভাব্য উদাহরণ, কোম্পানির কোনো ঘোষণা নয়।
চূড়ান্ত ডিভিডেন্ড নির্ভর করবে পুরো বছরের নিরীক্ষিত মুনাফা, নগদ প্রবাহ, ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক প্রয়োজন এবং পরিচালনা পর্ষদের ডিভিডেন্ড নীতির ওপর।
আর্থিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী?
বর্তমান আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে কোম্পানিটির কয়েকটি ইতিবাচক দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, ইপিএস ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, পরিচালন নগদ প্রবাহও আগের বছরের তুলনায় উন্নত হয়েছে। তৃতীয়ত, শেয়ারপ্রতি এনএভি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অর্থাৎ শুধু হিসাবের মুনাফা নয়, কোম্পানির পরিচালন নগদ প্রবাহ এবং সম্পদমূল্যও একই সময়ে উন্নতির দিকে রয়েছে। এ কারণে মৌলিক আর্থিক সূচকের দিক থেকে কোম্পানিটির বর্তমান অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী বলে বিবেচনা করা যায়।
এ ছাড়া কোম্পানিটির দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান ‘এএএ’ এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণমান ‘এসটি-১’ হিসেবে নিশ্চিত করেছে এমার্জিং ক্রেডিট রেটিং লিমিটেড। রেটিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গি স্থিতিশীল।
বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১৫ অক্টোবর
বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলসের বিনিয়োগকারীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ১৫ অক্টোবর ২০২৬। ওই দিন বিকেল সাড়ে ৩টায় কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হবে।
সভায় ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনার পাশাপাশি ডিভিডেন্ড ঘোষণার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ফলে ১৫ অক্টোবরের পরই কোম্পানিটির পূর্ণ বছরের আয়, মুনাফা এবং ডিভিডেন্ডের প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হবে। নয় মাসের শক্তিশালী আর্থিক ফলের কারণে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা বাড়লেও, শুধু ডিভিডেন্ডের সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
কারণ শেয়ারের বর্তমান বাজারদর, মূল্য-আয় অনুপাত, ডিভিডেন্ড ইয়েল্ড, ভবিষ্যৎ আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা, নগদ প্রবাহ এবং কোম্পানির ব্যবসায়িক ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আর্থিক ফল ভালো হওয়া ইতিবাচক সংকেত হলেও সেটি একা শেয়ারে বিনিয়োগের নিশ্চয়তা দেয় না।
























