আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি বন্ডের ইয়েল্ড বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে এশিয়ার কয়েকটি শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। উচ্চ জ্বালানি মূল্য মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়ে দিলে বিশ্বজুড়ে সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের শেয়ারবাজারেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নতুন করে বেড়েছে। এতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর পরিবর্তে দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখতে পারে—এমন আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডসহ বড় অর্থনীতির সরকারি বন্ডের ইয়েল্ড দ্রুত বেড়ে যায়।
শুক্রবার বন্ডের ইয়েল্ড কিছুটা কমলেও বাজারের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি খারাপ হলে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দুই প্রধান বেঞ্চমার্কের দামও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংকট নিরসনে এখনো কোনো সমঝোতা না হওয়া এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও সেনা পাঠাচ্ছে। এর মধ্যে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরী এবং এর সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজের বহর আগামী মাসে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে পারে। এতে অঞ্চলটিতে সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বাড়তি থাকলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর পরিবর্তে তা উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখতে কিংবা প্রয়োজনে বাড়াতে পারে। আর সুদের হার দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমে গিয়ে শেয়ারবাজারে চাপ তৈরি হতে পারে।
ফরেক্স ডটকমের ফাওয়াদ রাজাকজাদা বলেন, বন্ডবাজার এখন জুন ২০২৭-এর মধ্যে ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে আরও চার দফা সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে মূল্য নির্ধারণ করছে। অথচ বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শুরুর আগে বাজারের প্রত্যাশা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন একই সময়ের মধ্যে অন্তত ১০০ বেসিস পয়েন্ট সুদের হার কমার প্রত্যাশা ছিল।
তিনি আরও জানান, গত এক বছরে ব্লুমবার্গ কমোডিটি ইনডেক্স ৩৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। পণ্যের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে নতুন করে পণ্যমূল্যনির্ভর মূল্যস্ফীতির ঢেউ তৈরি হতে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য সুদের হার নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটে ইতিবাচক লেনদেন হলেও এশিয়ার বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। শুক্রবার হংকংয়ের বাজারে ২ শতাংশের বেশি দরপতন হয়েছে। টোকিও, সিঙ্গাপুর, ওয়েলিংটন, ম্যানিলা ও জাকার্তার বাজারও কমেছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়া, সিডনি ও তাইপের বাজার ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
বিনিয়োগকারীদের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের নন-ফার্ম পেরোলস বা কৃষি খাতের বাইরের কর্মসংস্থানের তথ্যের দিকে। এই তথ্য দেশটির শ্রমবাজারের শক্তি সম্পর্কে ধারণা দেবে এবং ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী সুদের হার-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতার সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের শেয়ারবাজারেও পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হলে সুদের হার কমানোর সুযোগ আরও সীমিত হয়ে যেতে পারে।
উচ্চ সুদের হার দীর্ঘস্থায়ী হলে ঋণনির্ভর ব্যবসা ও বিনিয়োগের ব্যয় বাড়বে। এতে ব্যাংক, শিল্প, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং আমদানিনির্ভর কোম্পানিগুলোর ব্যয় ও মুনাফায় চাপ পড়তে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ শেয়ারবাজারের পরিবর্তে তুলনামূলক নিরাপদ ও সুদনির্ভর সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের ইয়েল্ড ও বৈশ্বিক সুদের হার বেশি থাকলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে উন্নত দেশের তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এতে উদীয়মান বাজারগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ কমার ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে গেলে বাজারের তারল্য ও বিনিয়োগকারীদের মনোভাবেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এক দিনের দরপতনকে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে একই মাত্রার পতনের সরাসরি পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। কারণ দেশের বাজারে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে জ্বালানি তেলের দাম কত দিন উচ্চ পর্যায়ে থাকে, বৈশ্বিক সুদের হার কোন দিকে যায়, দেশের মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণের ওপর।
দেশীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য আগামী দিনগুলোতে ব্যাংক, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, শিল্প ও আমদানিনির্ভর কোম্পানিগুলোর ব্যয় ও মুনাফার সম্ভাব্য পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে রপ্তানিমুখী কিছু কোম্পানি বৈদেশিক মুদ্রার আয় থেকে সুবিধা পেলেও বৈশ্বিক চাহিদা কমে গেলে তাদের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
ফলে আগামী কয়েকটি লেনদেন দিবসে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের গতিপ্রকৃতি, জ্বালানি তেলের দাম, বন্ডের ইয়েল্ড, ডলার এবং সুদের হার-সংক্রান্ত তথ্যের দিকে বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে। পাশাপাশি দেশের মূল্যস্ফীতি, সুদের হার ও তারল্য পরিস্থিতিও বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে বৈশ্বিক বাজারের সাম্প্রতিক অস্থিরতা নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ দেখছেন না বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের শেয়ারবাজার নানা অর্থনৈতিক ও বাজারভিত্তিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ফলে বর্তমান বৈশ্বিক চাপ বাজারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হলেও তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা দেশীয় বাজারের রয়েছে।
বরং বৈশ্বিক পরিস্থিতি দ্রুত স্থিতিশীল হলে, জ্বালানি বাজারে চাপ কমলে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করলে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক গতি ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে।
























