ঢাকা   রোববার ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

ডিভিডেন্ড মৌসুমেও পতন, আস্থা ধরে রাখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ জরুরি

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:১৬, ৪ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

ডিভিডেন্ড মৌসুমেও পতন, আস্থা ধরে রাখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ জরুরি

ডিভিডেন্ড ঘোষণার মৌসুমেও থামছে না দেশের শেয়ারবাজারের দরপতন। সাধারণত জুন ক্লোজিং কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে এ সময়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। ধারাবাহিক পতনে সূচক ও লেনদেন কমার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাতেও চাপ তৈরি হচ্ছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে লোকসান এড়াতে অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন। তাই বাজারকে স্বাভাবিক ধারায় ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ারবাজারে উত্থান-পতন স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু টানা দরপতন যেমন বাজারের জন্য ইতিবাচক নয়, তেমনি দীর্ঘ সময়ের একটানা উত্থানও টেকসই বাজারের লক্ষণ নয়। একটি সুস্থ বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা, তারল্য ও মৌলভিত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সূচকের ওঠানামা থাকা প্রয়োজন।

বর্তমানে জুন ক্লোজিং কোম্পানিগুলোর ডিভিডেন্ড ঘোষণার মৌসুম চলছে। এ সময়ে ভালো কোম্পানির লভ্যাংশকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার সুযোগ থাকলেও বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং একের পর এক দরপতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।

সূচকে বড় পতন

সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার (৪ অক্টোবর) দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচক ও লেনদেন—দুটিই কমেছে। একই সঙ্গে লেনদেনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমেছে।

দিনশেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৪৯ দশমিক ২৮ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৪৮২ দশমিক ৩৬ পয়েন্টে নেমে এসেছে।

অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসইএস ১০ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৮৯ দশমিক ৬৭ পয়েন্টে এবং ডিএসই-৩০ সূচক ১৮ দশমিক ২৫ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৮৫ দশমিক ২৯ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

দিনটিতে ডিএসইতে মোট ৩৮৫টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে মাত্র ৬৬টির শেয়ারদর বেড়েছে। বিপরীতে দর কমেছে ২৯১টির এবং ৫২৮টির দর অপরিবর্তিত ছিল।

১৮০ কোটি টাকা কমেছে লেনদেন

সূচকের পাশাপাশি ডিএসইতে টাকার অঙ্কে লেনদেনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

রোববার ডিএসইতে প্রায় ৫৪২ কোটি ৯৮ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে এই লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭২৩ কোটি ১১ লাখ টাকা।

অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে প্রায় ১৮০ কোটি ১৩ লাখ টাকা। সূচকের পতনের সঙ্গে লেনদেনের এমন সংকোচন বাজারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা কমে যাওয়ারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সিএসইতেও নেতিবাচক চিত্র

অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই ধরনের নেতিবাচক চিত্র দেখা গেছে।

দিনটিতে সিএসইতে ১৩ কোটি ৩২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৭১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪০টির শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে। বিপরীতে ১১৪টির দর কমেছে এবং ১৭টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।

এদিন সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৭১ দশমিক ২০ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ৬৬০ দশমিক ৭৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আগের কার্যদিবসে সূচকটি ১৭ দশমিক ২৮ পয়েন্ট বেড়েছিল।

আস্থা ধরে রাখতে কী করা দরকার?

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, পতনের বাজারে কম দামে ভালো মৌলভিত্তির শেয়ার কেনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে মুনাফার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর সময় যদি দীর্ঘ হতে থাকে এবং ধারাবাহিক পতনের কোনো দৃশ্যমান সমাপ্তি না থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের ধৈর্য ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

এমন পরিস্থিতিতে অনেক বিনিয়োগকারী লাভের আশায় অপেক্ষা না করে লোকসানেই শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন। এতে বাজারের তারল্য আরও কমে যেতে পারে এবং পতনের চাপ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

তাই বাজারসংশ্লিষ্টরা এখন বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করা, ধারাবাহিক দরপতনের পেছনের কারণ চিহ্নিত করা এবং অনিয়ম থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের কাছে বাজারের স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্রিয়তার দৃশ্যমান বার্তা পৌঁছানো জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

তবে বাজার স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে শুধু সূচক ধরে রাখাই নয়, বরং বাজারের মৌলভিত্তি, কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়াও প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে সপ্তাহের শুরুতেই দেশের দুই শেয়ারবাজারে সূচক, লেনদেন ও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদরে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। ডিভিডেন্ড ঘোষণার মৌসুমেও যদি এই পতনের ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আরও চাপ তৈরি হতে পারে। সেই চাপ বাড়ার আগেই বাজারের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর উদ্যোগ এখন বিনিয়োগকারীদের অন্যতম প্রত্যাশা।

সর্বশেষ