ঢাকা   রোববার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে শেয়ারবাজারে ফিরছে বিদেশি বিনিয়োগ

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:০৮, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে শেয়ারবাজারে ফিরছে বিদেশি বিনিয়োগ

দীর্ঘদিনের মন্দা ও অর্থ প্রত্যাহারের প্রবণতা কাটিয়ে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে আবারও সক্রিয় হচ্ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ, ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, বিদেশি বিনিয়োগের অর্থ দেশে আনা-নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং আন্তর্জাতিক সূচক প্রদানকারী সংস্থা এমএসসিআইয়ের নিয়মিত পর্যালোচনায় ফেরার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বাজারে বিদেশিদের আস্থা কিছুটা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের ১ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন। বিপরীতে বিক্রি করেছেন প্রায় ১৮০ কোটি টাকার শেয়ার। ফলে এ সময়ে বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা।

মোট ১৬ কার্যদিবসের মধ্যে ১৩ কার্যদিবসেই বিদেশিদের বিক্রির তুলনায় শেয়ার কেনার পরিমাণ বেশি ছিল। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ সময় পর বিদেশিদের এমন ক্রয়প্রবণতা দেশের শেয়ারবাজারে তাদের আগ্রহ ফেরার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

যেসব কারণে ফিরছে বিদেশিদের আস্থা

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া বিভিন্ন নীতি ও সংস্কার উদ্যোগ বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশকে তুলনামূলক সহজ করেছে।

এর মধ্যে অন্যতম হলো ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার। দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারের সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করে রাখার পর তা তুলে নেওয়ায় বাজারে শেয়ারদর নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থা ফিরেছে।

এ ছাড়া ভালো মৌলভিত্তির দেশি-বিদেশি কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্ত করার সুযোগ তৈরি করতে নতুন বিধিমালার খসড়া প্রণয়ন এবং মার্জিন ঋণের নিয়ম সহজ করার উদ্যোগও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এমএসসিআইয়ের নিয়মিত পর্যালোচনায় ফেরার সিদ্ধান্ত

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে আন্তর্জাতিক সূচক প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এমএসসিআইয়ের সিদ্ধান্তকে।

এমএসসিআই জানিয়েছে, ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ সূচকের জন্য তাদের নিয়মিত পর্যালোচনা প্রক্রিয়া আবার চালু হবে। এর আগে ২০২৩ সালে ফ্লোর প্রাইসসংক্রান্ত জটিলতার কারণে বাংলাদেশকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছিল।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক সূচক ব্যবস্থার নিয়মিত পর্যালোচনায় ফিরে আসা বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের বাজারের প্রবেশযোগ্যতা ও বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে।

বিদেশিদের মূলধন ফেরানোর নিয়মও সহজ

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে অর্থ প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আগে বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির অর্থ বিদেশে নেওয়ার ক্ষেত্রে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুমোদনের প্রয়োজন হতো। বাংলাদেশ ব্যাংক এই সীমা বাড়িয়ে ১০০ কোটি টাকা করেছে।

এ ছাড়া প্রতিটি লেনদেনে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) ফার্মের সার্টিফিকেট নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে ব্যাংকগুলোকে সরাসরি কর কেটে বিদেশিদের অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে অর্থ প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা ও সময়ক্ষেপণ কমেছে।

কয়েক মাসে বিদেশিদের লেনদেনে বড় পরিবর্তন

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন মাত্র ৭৩ কোটি ৯২ লাখ টাকায় নেমে এসেছিল।

এরপর জুনে বিদেশিদের লেনদেন বেড়ে ৫৪০ কোটি টাকা এবং জুলাইয়ে ৫২৩ কোটি টাকায় ওঠে। আগস্টে তা কিছুটা কমে ৩১৮ কোটি টাকায় দাঁড়ালেও সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনেই বিদেশিদের মোট লেনদেন ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে বিদেশিদের বাজারে অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

১৩২ কোম্পানিতে বিদেশিদের শেয়ারধারণ

বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। তবে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত প্রায় ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে বিদেশিদের শেয়ারধারণ রয়েছে ১৩২টি কোম্পানিতে।

বিদেশি বিনিয়োগের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি শেয়ারধারণ রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকে, যেখানে বিদেশিদের অংশ প্রায় ৩৫ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, যেখানে বিদেশি শেয়ারধারণ ২৫ শতাংশের বেশি।

এ ছাড়া বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস এবং রেনাটা লিমিটেডেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উল্লেখযোগ্য শেয়ারধারণ রয়েছে।

সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ (সিডিবিএল)–এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিদেশি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের (এনআরবি) বিও হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৯৩৭টি।

সব মিলিয়ে, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনে বিদেশিদের নিট ক্রয়, লেনদেন বৃদ্ধির পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্কার ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বাজার নিয়ে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে নতুন গতি তৈরি করেছে। তবে এই প্রবণতা কতটা স্থায়ী হয়, তা নির্ভর করবে বাজারের তারল্য, নীতিগত ধারাবাহিকতা, কোম্পানির মৌলভিত্তি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ লেনদেনের ওপর।

সর্বশেষ