ঢাকা   রোববার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

শেয়ারবাজারে এআই নজরদারি, অস্বাভাবিক লেনদেনে আসবে ‘রেড ফ্ল্যাগ’

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫:৫০, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

শেয়ারবাজারে এআই নজরদারি, অস্বাভাবিক লেনদেনে আসবে ‘রেড ফ্ল্যাগ’

শেয়ারবাজারে কারসাজি, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পথে যাচ্ছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। আগামী এক বছরের মধ্যে বর্তমান সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কোনো শেয়ারের দাম, লেনদেনের পরিমাণ কিংবা লেনদেনের ধরনে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্ক সংকেত বা ‘রেড ফ্ল্যাগ’ তৈরি হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত লেনদেন স্থগিত করার সুযোগও রাখা হবে। এতে বাজারের অস্বাভাবিক কার্যক্রম শনাক্তে সময় কমার পাশাপাশি নজরদারি আরও প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এখন যেভাবে চলছে নজরদারি

বর্তমানে ডিএসইর সার্ভিল্যান্স বিভাগ রিয়েল-টাইম বাজার তথ্য বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক মূল্য ও লেনদেন শনাক্ত করে। চলতি বছরের জুনে প্রায় এক দশক পর রিয়েল-টাইম সার্ভিল্যান্সের ভিত্তিতে সোনারগাঁও টেক্সটাইলস, শ্যামপুর সুগার মিলস ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছিল। এসব পদক্ষেপের কারণ হিসেবে অস্বাভাবিক মূল্যগতিবিধির কথা জানানো হয়।

বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো শেয়ারে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য রয়েছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী সন্দেহজনক লেনদেন বা কারসাজির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়।

অর্থাৎ, প্রযুক্তি প্রাথমিক সংকেত দিলেও চূড়ান্ত বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্তে মানুষের ভূমিকা এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

এআই এলে কী বদলাবে

বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানিয়েছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে ডিএসইকে এআইভিত্তিক সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থায় যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় ট্রিগারের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রস্তাবিত এআই ব্যবস্থা শুধু শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে কি না, তা দেখবে না। লেনদেনের পরিমাণ ও ঘনত্ব, একই বা সংশ্লিষ্ট হিসাবের লেনদেনের ধরন, একই সময়ে কেনাবেচা, সম্ভাব্য ওয়াশ ট্রেড, সার্কুলার ট্রেডিং, ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের সম্ভাব্য প্যাটার্ন এবং পাম্প অ্যান্ড ডাম্পের মতো আচরণ বিশ্লেষণেও এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।

এ ছাড়া কোনো কোম্পানির মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের সময়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শেয়ারে লেনদেনের পরিবর্তনের সম্পর্কও বিশ্লেষণ করার সুযোগ থাকবে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেওয়াইসি তথ্য

এআই সার্ভিল্যান্স চালুর ক্ষেত্রে শুধু সফটওয়্যার স্থাপনই যথেষ্ট নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো বাজারের লেনদেনের তথ্যের সঙ্গে গ্রাহকের কেওয়াইসি বা পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের সমন্বয়।

ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার জানিয়েছেন, বর্তমান সার্ভিল্যান্স প্ল্যাটফর্মের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো এটি কেওয়াইসি তথ্যের সঙ্গে সমন্বিত নয়।

কারণ, কোনো শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে—এটি এআই সহজেই শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু এর পেছনে কারা সক্রিয়, একাধিক হিসাব একই ব্যক্তি বা বেনিফিশিয়াল ওনারের নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, কিংবা বিভিন্ন হিসাবের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব বুঝতে লেনদেনের তথ্যের সঙ্গে পরিচয় ও মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য যুক্ত করতে হবে।

এ জন্য ডিএসইর ট্রেডিং ডেটার পাশাপাশি সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল), বিএসইসি এবং ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় তথ্য সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

প্রয়োজন শক্তিশালী প্রযুক্তিগত অবকাঠামো

এআইভিত্তিক সার্ভিল্যান্স কার্যকর করতে প্রথমেই দরকার নির্ভরযোগ্য রিয়েল-টাইম ডেটা অবকাঠামো। প্রতিটি অর্ডার, লেনদেন, মূল্য, পরিমাণ ও সময়ের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা থাকতে হবে।

একই সঙ্গে ডিএসই, সিডিবিএল, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয় তথ্য নিরাপদ কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করতে হবে। এআই মডেলকেও এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে শুধু নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই সংকেত না দেয়; বরং স্বাভাবিক লেনদেনের আচরণ থেকে অস্বাভাবিক বিচ্যুতিও শনাক্ত করতে পারে।

এর সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, ডেটার গোপনীয়তা এবং অডিট ট্রেইল নিশ্চিত করাও জরুরি।

এআই কি মানুষের জায়গা নেবে?

নতুন ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য হবে দ্রুত অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করা। তবে এআইকে পুরোপুরি মানুষের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের পরিবর্তে বিশ্লেষকদের সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

ডিএসইর এমডি নুজহাত আনোয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, এআইয়ের কাজ হবে অস্বাভাবিক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করে সতর্ক সংকেত দেওয়া; এরপর বাজার বিশ্লেষকরা সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবেন।

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোনো শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়লেই সেটি কারসাজির প্রমাণ নয়। ব্যবসায়িক ফলাফল, নতুন বিনিয়োগ, করপোরেট ঘোষণা কিংবা অন্য কোনো বৈধ কারণে শেয়ারের দাম ও লেনদেনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

ফলে এআইয়ের দেওয়া প্রতিটি সংকেতের পর মানবীয় যাচাইয়ের প্রয়োজন থাকবে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য কী পরিবর্তন আসতে পারে

এআইভিত্তিক নজরদারি কার্যকর হলে অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তে সময় কমতে পারে। কোনো শেয়ারে সন্দেহজনক কার্যক্রম দেখা দিলে দ্রুত সতর্ক সংকেত পাওয়া গেলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়াও আরও দ্রুত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে এর বিপরীতে ভুল সংকেতের ঝুঁকিও থাকবে। কোনো স্বাভাবিক লেনদেনকে ভুলভাবে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে লেনদেন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আবার অসম্পূর্ণ বা পুরোনো কেওয়াইসি তথ্য থাকলে এআইয়ের বিশ্লেষণও দুর্বল হতে পারে।

প্রযুক্তির পাশাপাশি দরকার তথ্যের সমন্বয়

শেয়ারবাজারে এআই সার্ভিল্যান্স চালুর উদ্যোগ মূলত বাজার নজরদারিকে আরও দ্রুত ও তথ্যনির্ভর করার পরিকল্পনা। তবে এর কার্যকারিতা শুধু অত্যাধুনিক সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করবে না।

রিয়েল-টাইম লেনদেনের তথ্য, কেওয়াইসি ও বেনিফিশিয়াল ওনারের তথ্য, ডেটা ইন্টিগ্রেশন, সাইবার নিরাপত্তা এবং দক্ষ জনবল—সবগুলো উপাদান একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে।

অর্থাৎ, শেয়ারবাজারে এআইয়ের ‘রেড ফ্ল্যাগ’ যত দ্রুতই জ্বলুক, সেই সংকেতের ভিত্তিতে সঠিক তথ্য যাচাই ও যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।

সর্বশেষ