বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান শেয়ারবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সমন্বিত নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। একই সঙ্গে বাজারে ভালো ও মানসম্পন্ন কোম্পানি আনতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ ও কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ তাকে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। পরে বিএসইসি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বর্তমানে আইপিও অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তার মতে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো কী ধরনের সুবিধা পায়, সে বিষয়টি উদ্যোক্তাদের কাছে আরও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে। তালিকাভুক্তির সুফল সম্পর্কে সঠিক ধারণা তৈরি হলে আরও বেশি প্রতিষ্ঠান বাজারে আসতে আগ্রহী হবে।
মাসুদ খান বলেন, গত কয়েক বছরে অনেক প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে আসার আগ্রহ প্রকাশ করলেও নানা জটিলতা ও প্রক্রিয়াগত ধীরগতির কারণে তারা তালিকাভুক্ত হয়নি। ফলে বাজারে মানসম্পন্ন কোম্পানির ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিকে বাজারে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, শুধু আলোচনা নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমে ফল দেখাতে চান তারা। সময়ই বলে দেবে কী করা সম্ভব হবে।
করনীতি ও সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব
নতুন চেয়ারম্যান বলেন, শেয়ারবাজারের টেকসই উন্নয়নের জন্য বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।
তার ভাষ্য, পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত অনেক সিদ্ধান্ত একাধিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাত, পুঁজিবাজার এবং রাজস্ব নীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে উঠলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারের ব্যবধান বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
সংবাদ সম্মেলনে মাসুদ খান স্পষ্ট ভাষায় জানান, বাজার কারসাজি, অনিয়ম এবং আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অতীতের তুলনায় আরও কঠোর অবস্থান নেবে বিএসইসি।
তিনি বলেন, বাজারের শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। যারা কারসাজি বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তার মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সুশাসন, তথ্য প্রকাশ এবং মুনাফা দেশে ফিরিয়ে নেওয়া (রিপ্যাট্রিয়েশন) নিয়ে কিছু উদ্বেগ রয়েছে। কমিশন এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে।
ডিজিটালাইজেশন ও তথ্যপ্রকাশে স্বচ্ছতা
নতুন চেয়ারম্যান জানান, শেয়ারবাজারে তথ্যপ্রকাশের মান আরও উন্নত করা হবে এবং ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে তথ্যপ্রবাহ বাড়ানো হবে। তদন্ত কার্যক্রম ও আর্থিক তথ্য প্রকাশেও স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস) অনুযায়ী যথাযথ প্রভিশনিং নিশ্চিতের বিষয়ে নজর দেওয়া হবে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন।
‘গল্প নয়, কাজ দিয়েই মূল্যায়ন করুন’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মাসুদ খান বলেন, অতীতের কমিশনগুলোর নানা প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সমালোচনা রয়েছে। তবে বর্তমান কমিশনকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
তিনি বলেন, “এটি আমাদের প্রথম সংবাদ সম্মেলন। আমরা কী বলছি তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা কী করছি। এক বছর পর যদি কথার সঙ্গে কাজের মিল না পাওয়া যায়, তখন সমালোচনা করবেন।”
তিনি আরও বলেন, শেয়ারবাজারের নানা সমস্যা ও বাস্তবতা সম্পর্কে তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। লাফার্জহোলসিম সিমেন্টের (তৎকালীন) প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা হিসেবে দেশের অন্যতম বড় আইপিও পরিচালনার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার। ফলে বাজারের বিভিন্ন অংশীজন ও মধ্যস্থতাকারীদের সমস্যা সম্পর্কে তিনি অবগত।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগনির্ভর বাজার গড়ার লক্ষ্য
মাসুদ খান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও সেই তুলনায় পুঁজিবাজারের বিকাশ ঘটেনি। তাদের লক্ষ্য খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে দেশের পুঁজিবাজারকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীনির্ভর উদীয়মান বাজারে রূপান্তর করা।
তিনি মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, একটি কার্যকর ও প্রাণবন্ত পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে আরও ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে হবে।
একই সঙ্গে তিনি জানান, কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ঋণ ও মূলধনের পরিমাণ নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে সেই প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নতুন কমিশনের প্রতি আশাবাদ
নবনিযুক্ত কমিশনার নাফিজ-আল-তারিক বলেন, তারা এমন সময়ে দায়িত্ব নিয়েছেন যখন পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট রয়েছে। সমন্বিতভাবে কাজ করে সেই আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হবে।
কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান বাজার উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন। আরেক কমিশনার নাহিদ মাহতাব বলেন, বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধান যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাজারের উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।
প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি বলেন, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের প্রতিটি খাতে উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। তাদের লক্ষ্য শুধু বাজারকে স্থিতিশীল করা নয়, বরং এটিকে একটি আঞ্চলিক শক্তিশালী বাজারে পরিণত করা।
তিনি আরও বলেন, উদ্যোক্তাদের মধ্যে আর্থিক জ্ঞান বা ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদেরও ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে, কারণ শেয়ারবাজার কোনো সঞ্চয় হিসাব নয়।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের শেয়ারবাজার বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত। ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ব্যাংকিং খাতেও চাপ তৈরি করেছে। নতুন নেতৃত্বের অধীনে বিএসইসি বাজারে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন চেয়ারম্যানের বক্তব্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, কঠোর নজরদারি এবং বাস্তবভিত্তিক সংস্কারের যে বার্তা এসেছে, তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশাবাদ তৈরি করেছে। তবে এখন বাজারের অংশীজনরা কথার চেয়ে কার্যকর বাস্তবায়নের দিকেই বেশি নজর রাখবেন।























