দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের আলোচিত দুটি প্রতিষ্ঠান—জেনেক্স ইনফোসিস পিএলসির ও আকিজ ব্লুপিল লিমিটেড—এর মধ্যে কোটি টাকার একটি প্রযুক্তি সরবরাহ প্রকল্পকে ঘিরে গুরুতর অনিয়ম, অস্বচ্ছ লেনদেন ও তথাকথিত ‘ছায়া-চুক্তি’র অভিযোগ উঠেছে। নথিপত্র, ইমেইল যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে—পুরো লেনদেনটি হয়েছে আনুষ্ঠানিক চুক্তির বাইরে, যেখানে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া, অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা এবং ব্যক্তিস্বার্থের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
লিখিত চুক্তি ছাড়াই প্রকল্প বাস্তবায়নের চাপ
২০২৪ সালের শেষ দিকে ব্যাংক এশিয়ার তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা (সিকিউরিটি ইনফরমেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও স্বয়ংক্রিয় সাইবার প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা) প্রকল্প এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর–এর ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের জন্য জেনেক্স, আকিজ ব্লুপিলের কাছে সফটওয়্যার লাইসেন্স ও সংশ্লিষ্ট সেবা সরবরাহের অনুরোধ জানায়।
প্রকল্প দুটি আকারে বড় হওয়ায় আকিজ ব্লুপিল ধরে নেয়—জেনেক্সের সঙ্গে একটি ব্যাক-টু-ব্যাক চুক্তি (এক পক্ষের চুক্তির বিপরীতে আরেক পক্ষের আনুষ্ঠানিক চুক্তি) সম্পাদিত হবে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, জেনেক্স কোনো লিখিত চুক্তি বা আনুষ্ঠানিক সমঝোতা দেয়নি। তা সত্ত্বেও দ্রুত পণ্য সরবরাহের জন্য বারবার তাগাদা দিতে থাকে।
শতভাগ অগ্রিম পরিশোধ, পরে ঝুঁকি চাপানো
সময়চাপ, প্রকল্পের গুরুত্ব এবং জেনেক্সের আশ্বাসের ওপর ভরসা করে আকিজ ব্লুপিল বাধ্য হয়ে চুয়াডাঙ্গাভিত্তিক ছোট প্রতিষ্ঠান ‘এবিসি নেটওয়ার্ক’–এর কাছ থেকে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ টাকার সফটওয়্যার লাইসেন্স শতভাগ অগ্রিম পরিশোধে সংগ্রহ করে।
এরপর জেনেক্স আকিজ ব্লুপিলের কাছে ২ কোটি ৫১ লাখ টাকার ক্রয়াদেশ (পারচেজ অর্ডার) পাঠায়। শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে এগোচ্ছে বলেই মনে হচ্ছিল।
প্রকল্প বাতিল: এক বাক্যে দায়মুক্তির চেষ্টা
কিন্তু প্রকল্পের মাঝপথে এসে পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। ব্যাংক এশিয়া প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়। এরপর জেনেক্স আকিজ ব্লুপিলকে জানায়— ব্যাংক এশিয়ার বিষয়টি তোমাদের সমস্যা।
আকিজ ব্লুপিলের কর্মকর্তাদের দাবি, এই এক বাক্যের মাধ্যমেই জেনেক্স পুরো আর্থিক ও ব্যবসায়িক ঝুঁকি তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়। প্রকল্প বাতিলের পর জেনেক্সের ভেতরে দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ সামনে আসেননি বলেও অভিযোগ উঠেছে।
কোটি টাকার বকেয়া, কিন্তু দায় নিচ্ছে না কেউ
আকিজ ব্লুপিলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জেনেক্স এখনো তাদের কোটি টাকার বেশি বকেয়া পরিশোধ করেনি। যেসব কর্মকর্তা এই প্রকল্প পরিচালনা করতেন, তারা বর্তমানে জেনেক্সে কর্মরত নন। ফলে এখন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কেউই এই দায় স্বীকার করতে রাজি হচ্ছেন না।
তিনি জানান, আকিজ ব্লুপিলের ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের প্রধান ডায়ানা পারভীন নিয়মিতভাবে বকেয়া অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে জেনেক্সের পক্ষ থেকে এখনো কোনো লিখিত প্রতিশ্রুতি বা নির্দিষ্ট সময়সূচি দেওয়া হয়নি।
পাল্টা অভিযোগ ও ‘ব্যক্তিগত সুবিধা’র প্রসঙ্গ
অন্যদিকে জেনেক্সের এক কর্মকর্তা পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, আকিজ ব্লুপিলের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হলেও সিদ্ধান্তগুলো সময়মতো কার্যকর হয়নি। তার ভাষায়, আকিজ ব্লুপিলের এক নারী কর্মকর্তা ব্যক্তিগত সুবিধা না পাওয়ায় কয়েকবার বিষয়টি পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।
তিনি আরও দাবি করেন, জেনেক্স ২ কোটি ৫১ লাখ টাকার ক্রয়াদেশ দিলেও বর্তমানে ২ কোটি ৩৩ লাখ টাকার লেনদেন নিয়ে আলোচনা চলছে। বাকি অংশ থেকে ১০ লাখ টাকা ব্যক্তিগতভাবে পরিশোধ করে দ্রুত সমাধানের প্রস্তাবও এসেছে, যা নিজেই লেনদেনের স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
ভয়াবহ অসঙ্গতি: ৮ হাজার লাইসেন্স কিনে ইনভয়েসে ৩ হাজার
নথিপত্র বিশ্লেষণে উঠে এসেছে সবচেয়ে গুরুতর অনিয়মের তথ্য।
আকিজ ব্লুপিল, এবিসি নেটওয়ার্কের কাছ থেকে ৮ হাজার তথ্যনিরাপত্তা সফটওয়্যার লাইসেন্স ক্রয় করেছে।
জেনেক্সের কাছে দেওয়া ডেলিভারি চালানেও ৮ হাজার লাইসেন্স উল্লেখ রয়েছে।অথচ জেনেক্সকে দেওয়া চূড়ান্ত বিল বা ইনভয়েসে দেখানো হয়েছে মাত্র ৩ হাজার লাইসেন্স।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অসঙ্গতি সাধারণত দেখা যায় যখন কোনো প্রতিষ্ঠান প্রকৃত লেনদেন আড়াল করতে চায়, অভ্যন্তরীণ অনুমোদন সীমা এড়াতে চায় বা ছায়া-ব্যবসার পথ বেছে নেয়। ফলে পুরো লেনদেনটি আরও সন্দেহজনক হয়ে উঠেছে।
কারা ছিলেন এই লেনদেনে যুক্ত
জেনেক্স ইনফোসিস পিএলসির পক্ষ থেকে:
গাজী কুতুব উদ্দিন — মহাব্যবস্থাপক ও কৌশলগত ব্যবসা প্রধান
শুভাশিস দে — সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা বিভাগের ব্যবস্থাপক
মো. মোস্তাক আহমেদ — প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা
আকিজ ব্লুপিল লিমিটেডের পক্ষ থেকে:
জি. এম. কামরুল হাসান — প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
সৈয়দ তানভীর হাসান — সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান
ডায়ানা পারভীন — ব্যবসা বিভাগের প্রধান (বর্তমানে বকেয়া আদায়ে সক্রিয়)
এছাড়া, এবিসি নেটওয়ার্ক–এর রিলেশনশিপ ম্যানেজার মো. মোশাররফ হোসেন প্রোফর্মা ইনভয়েসে অনুমোদনকারী হিসেবে উল্লেখ রয়েছেন। এত বড় আন্তর্জাতিক মানের সফটওয়্যার সরবরাহে একটি ছোট স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্ত ছাড়া সত্য উদঘাটন কঠিন
সব মিলিয়ে এটি এমন একটি লেনদেন, যেখানে
লিখিত চুক্তি ছাড়াই কোটি টাকার অগ্রিম পরিশোধ
সফটওয়্যার লাইসেন্স সংখ্যায় ভয়াবহ গরমিল
দায় এড়ানোর প্রবণতা
ব্যক্তিস্বার্থ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের অভিযোগ
সবকিছু মিলিয়ে ঘটনাটি এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি রাখে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় এই অভিযোগগুলো আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে জানতে জেনেক্স ইনফোসিস পিএলসির কোম্পানি সেক্রেটারি রিয়াজ উদ্দিন ভূইয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
























