নির্বাচনের রেশ শেয়ারবাজারে
শান্তিপূর্ণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ফলাফলের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের শেয়ারবাজারে। বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরেছে বাজারে। এর ফলেই সূচক ও লেনদেনে বড় উত্থান দেখা গেছে, বিশেষ করে বিএনপি নেতাদের মালিকানাধীন ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারে ছিল বাড়তি আগ্রহ।
সূচকে বড় লাফ, লেনদেন হাজার কোটির ঘর
রোববার লেনদেন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ–এর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২০১ পয়েন্ট বা প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টে। একই দিনে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা, যা গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাজার মূলধন এক দিনেই বেড়েছে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।
শুরুতেই উচ্ছ্বাস
নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম কার্যদিবস হওয়ায় লেনদেন শুরুর পর থেকেই বাজার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। প্রথম ঘণ্টায় সূচক ১০০ পয়েন্টের বেশি বেড়ে যায় এবং লেনদেন ছাড়ায় ৪০০ কোটি টাকা। দিন শেষে লেনদেন হওয়া ৩৯৪ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯২ শতাংশের শেয়ারদর বেড়েছে।
চট্টগ্রাম বাজারেও গতি
ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ–এও দেখা গেছে ইতিবাচক প্রবণতা। রোববার সিএসই সূচক বেড়েছে ৪৮৪ পয়েন্ট বা সোয়া ৩ শতাংশ। লেনদেন হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা, যা নির্বাচনের আগের দিনের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।
বিএনপি-সংশ্লিষ্ট শেয়ারে চাহিদা
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর দলটির নেতা ও নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। ভালো মৌলভিত্তির ব্যাংক ও শিল্প খাতের শেয়ারগুলোই ছিল লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে।
ঢাকা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংকে উত্থান
ঢাকার বাজারে লেনদেনে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ঢাকা ব্যাংক। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের পরিবারের মালিকানাধীন এই ব্যাংকের শেয়ারদর এক দিনেই সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বেড়েছে। একইভাবে বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টুর মালিকানাধীন ন্যাশনাল ব্যাংক, কে অ্যান্ড কিউ ও দুলামিয়া কটনের শেয়ারেও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে।
মুন্নু গ্রুপের শেয়ারে চাঙ্গাভাব
মানিকগঞ্জ থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত আফরোজা খানমের নেতৃত্বাধীন মুন্নু গ্রুপের সব কটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারই এদিন বেড়েছে। মুন্নু ফেব্রিকস ও মুন্নু সিরামিকসের শেয়ার সর্বোচ্চ সীমায় উঠে আসে, লেনদেনেও ছিল শীর্ষে।
জামায়াত-সংশ্লিষ্ট শেয়ারে দরপতন
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারে দেখা গেছে বিপরীত চিত্র। ইসলামী ব্যাংক ও ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ারদর এদিন কমেছে। বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি মূলত নির্বাচনী ফলাফলের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের সতর্ক বার্তা
ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন শেষে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে কোম্পানির ব্যবসা, আয়, মুনাফা ও লভ্যাংশই হওয়া উচিত মূল বিবেচ্য—না হলে দরবৃদ্ধি টেকসই হয় না।
মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবেই বাজার
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী এই উত্থান বাজারের স্বাভাবিক আচরণ। তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে কোনো শেয়ারের দাম বাড়া বা কমা দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হয় না। শেষ পর্যন্ত বাজার চলবে কোম্পানির মৌলভিত্তি ও আর্থিক সক্ষমতার ওপরই।
























