ঢাকা   রোববার ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৩ ফাল্গুন ১৪৩২

সংসদে ব্যবসায়ীদের দাপট! নির্বাচিত এমপিদের ৫৯ শতাংশই ব্যবসায়ী

অর্থ ও বাণিজ্য

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:৪৮, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সংসদে ব্যবসায়ীদের দাপট! নির্বাচিত এমপিদের ৫৯ শতাংশই ব্যবসায়ী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী সংসদ সদস্যদের মধ্যে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। নির্বাচিত এমপিদের ৫৯ শতাংশই পেশায় ব্যবসায়ী। একই সঙ্গে নতুন সংসদের বড় অংশ উচ্চশিক্ষিত ও বয়সে প্রবীণ—জয়ী প্রার্থীদের ৮৩ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত এবং ৭৩ শতাংশের বয়স ৫০ বছরের বেশি।

গত বৃহস্পতিবার ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট গ্রহণ হয়। শেরপুর-৩ আসনে প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত থাকায় এবং দুই আসনের ফল প্রকাশে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় মোট ২৯৭ জন জয়ী প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে জমা দেওয়া প্রার্থীদের হলফনামা থেকে, যেখানে বয়স, শিক্ষা, পেশা, আয়-সম্পদ ও মামলার তথ্যসহ ১০ ধরনের তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, জয়ী প্রার্থীদের মধ্যে ১৭৪ জন নিজেদের মূল পেশা হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ করেছেন। একাধিক পেশা উল্লেখ থাকলেও প্রথমে যে পেশার নাম দেওয়া হয়েছে, সেটিকেই মূল পেশা হিসেবে ধরা হয়েছে। দলভিত্তিক হিসাবেও ব্যবসায়ীদের আধিক্য স্পষ্ট। বিএনপির ২০৯ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ১৪৫ জনই ব্যবসায়ী, যা দলটির মোট বিজয়ীর প্রায় ৬৯ শতাংশ। জামায়াতে ইসলামীর ৬৮ জন জয়ীর মধ্যে ২০ জন ব্যবসায়ী। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে নির্বাচিত ছয়জনের মধ্যে দুজন এবং স্বতন্ত্রভাবে জয়ী সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই ব্যবসায়ী।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে যেখানে ব্যবসায়ীদের হার ছিল মাত্র ১৮ শতাংশ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ১৯৯১ সালে এই হার দাঁড়ায় ৩৮ শতাংশে। তখন সংসদে রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ও বিভিন্ন পেশার মানুষের তুলনামূলক ভারসাম্য থাকলেও বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।

সংসদে ব্যবসায়ীদের প্রভাব বৃদ্ধির ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য বাড়লে ব্যবসা ও রাজনীতি একাকার হয়ে যায় এবং রাজনীতি ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক মুনাফার হাতিয়ারে পরিণত হয়। এতে আইনি ও নীতিগত কাঠামো প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী মহলের দখলে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, ২৯৭ জনের মধ্যে ৩৬ জন আইনজীবী, ১২ জন চিকিৎসক, ১০ জন রাজনীতিবিদ, এবং শিক্ষকতা পেশা উল্লেখ করেছেন ২৮ জন। কৃষিকে পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন মোট ১৭ জন প্রার্থী। অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের তুলনায় অন্যান্য পেশাজীবীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

শিক্ষাগত যোগ্যতায়ও সংসদের চিত্র বেশ আলাদা। জয়ী ২৯৭ জনের মধ্যে ২৪৭ জনই স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের উচ্চশিক্ষিত। বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬০ বছরের বেশি বয়সী এমপির সংখ্যা ১৪৫ জন এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সী ৪৭ জন। অন্যদিকে, ৩০ বছরের নিচে নির্বাচিত এমপির সংখ্যা হাতে গোনা।

সব মিলিয়ে নতুন সংসদে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার উপস্থিতি থাকলেও, ব্যবসায়ী শ্রেণির প্রভাব কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। নতুন সরকার এই বাস্তবতায় কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করে, সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক ও সচেতন মহল।