ঢাকা   বুধবার ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩

বিদেশি অংশীদার পাওয়ার সুখবর, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আগ্রহ কাতার ইসলামিক ব্যাংকের

অর্থ ও বাণিজ্য

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:৫২, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিদেশি অংশীদার পাওয়ার সুখবর, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আগ্রহ কাতার ইসলামিক ব্যাংকের

পাঁচ দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য বিদেশি কৌশলগত অংশীদার পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কাতারের বৃহত্তম ইসলামী ব্যাংক কাতার ইসলামিক ব্যাংক (কিউআইবি) নতুন এ ব্যাংকে বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বে আগ্রহ দেখিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক ভিত আরও শক্তিশালী করা, তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি, খেলাপি ঋণ আদায় এবং আন্তর্জাতিক মানের ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতেই বিদেশি কৌশলগত অংশীদার যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীকে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর কাতার সফরকালে কাতার ইসলামিক ব্যাংকের সঙ্গে সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। ওই আলোচনায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে কিউআইবির বিনিয়োগের সম্ভাবনাও উঠে আসে।

এদিকে, গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পুনর্গঠন কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে ব্যাংকটির বর্তমান আর্থিক অবস্থা, মূলধন কাঠামো, পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এবং বিদেশি কৌশলগত অংশীদার নির্বাচনের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হয়। আলোচনায় কাতার থেকে সম্ভাব্য বিনিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

কেন বিদেশি অংশীদার খুঁজছে সরকার

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন ব্যাংকটির পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটি শক্তিশালী অংশীদারকে ব্যাংকটির সঙ্গে যুক্ত করতে চায় সরকার।

বিদেশি অংশীদার যুক্ত হলে শুধু নতুন মূলধনই নয়, আধুনিক ব্যাংকিং প্রযুক্তি, উন্নত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সুশাসন এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনার অভিজ্ঞতাও পাওয়া যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

পাঁচ ব্যাংক মিলিয়ে নতুন যাত্রা

দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, তারল্য সংকট ও বিপুল খেলাপি ঋণের চাপে থাকা পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো হলো—এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

এই পাঁচ ব্যাংককে এক ছাতার নিচে এনে একটি শক্তিশালী ও টেকসই ইসলামী ব্যাংক গড়ে তোলার লক্ষ্যেই বর্তমানে বড় ধরনের পুনর্গঠন কার্যক্রম চলছে।

২০ হাজার কোটি টাকার সরকারি মূলধন সহায়তা

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা।

এরই মধ্যে সরকার ব্যাংকটির মূলধন শক্তিশালী করতে ২০ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের অর্থ শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে মূলধনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

আমানতকারীদের অর্থ ফেরাতে বিশেষ ব্যবস্থা

আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স ফান্ড থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত ফেরত দেওয়ার কর্মসূচির আওতায় জুলাই পর্যন্ত প্রায় ৮ লাখ ২২ হাজার গ্রাহককে মোট ৩ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

পরবর্তীতে গ্রাহকদের প্রয়োজনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অর্থ উত্তোলনের সীমা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে।

খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রায় ১০ হাজার মামলা

নতুন ব্যাংকটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হচ্ছে বিপুল খেলাপি ঋণ আদায়। এ লক্ষ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার মামলা করা হয়েছে। আরও বেশ কিছু মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।

খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার বাড়াতে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি অন্যান্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

পুনর্গঠনে বদলে যাচ্ছে পুরো ব্যাংকিং কাঠামো

পাঁচ ব্যাংক একীভূত হওয়ার পর প্রায় ১৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ, দায়িত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো নতুন করে সমন্বয় করা হচ্ছে। পাশাপাশি পৃথক পাঁচ ব্যাংকের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাকেও একটি অভিন্ন কাঠামোর আওতায় আনার কাজ চলছে।

কোর ব্যাংকিং সিস্টেম, সুইফটসহ অন্যান্য প্রযুক্তিগত অবকাঠামো একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক প্রয়োজন, পরিচালন ব্যয় ও কার্যকারিতা বিবেচনায় ব্যাংকটির ৭৮০টি শাখা এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০টি ব্যবসায়িক ইউনিট পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে।

বিদেশি কৌশলগত অংশীদার যুক্ত করার উদ্যোগ সফল হলে মূলধন ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘ সংকট কাটিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক একটি শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক মানের ইসলামী ব্যাংকে রূপ নেওয়ার নতুন সুযোগ পাবে।