সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার পথ সহজ করতে বিদেশি কৌশলগত অংশীদার আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন মুসলিম দেশ ও সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ব্যাংকটিতে বিনিয়োগের জন্য কাতারকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি কাতার সফরের সময় দেশটির কাছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হওয়ার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
টিবিএসকে তিতুমীর বলেন, কাতারকে কৌশলগত অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সামনে কাতারের সঙ্গে আরও আলোচনা হবে। পাশাপাশি অন্যান্য মুসলিম দেশ ও সংস্থাকেও ব্যাংকটির অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হবে।
তিনি জানান, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতের ওপর আগে নেওয়া ‘হেয়ারকাট’ সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। ফলে আমানতকারীদের পাওনা অর্থ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে।
তিতুমীরের ভাষ্য অনুযায়ী, আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে দুটি পথ রয়েছে। একটি হলো সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ দেওয়া। অন্যটি হলো বিদেশি কোনো রাষ্ট্র বা সংস্থাকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ব্যাংকের মালিকানায় যুক্ত করা। মূলত এ কারণেই মুসলিম দেশ ও সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বিনিয়োগ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৌশলগত অংশীদারের ভূমিকা কী
কৌশলগত অংশীদার শুধু অর্থ বিনিয়োগকারী হিসেবে থাকেন না। সাধারণত ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং কার্যক্রম সম্প্রসারণে তারা সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
এ ধরনের অংশীদার বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি তহবিল বা ইক্যুইটি বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের মূলধন শক্তিশালী করতে পারেন। একই সঙ্গে প্রয়োজনের সময় আর্থিক সহায়তা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারেন।
এফডিআরের টাকা তুললেও মিলবে না মুনাফা
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং রেগুলেশন ডিপার্টমেন্ট গতকাল একটি সার্কুলার জারি করেছে।
সার্কুলার অনুযায়ী, ব্যাংকের গ্রাহকেরা তাদের ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট (এফডিআর) হিসাবে থাকা পুরো মূল অর্থ একবারে তুলে নিতে পারবেন। তবে এভাবে টাকা নগদায়ন করলে কোনো মুনাফা পাওয়া যাবে না।
এফডিআরের ওপর মুনাফা পেতে হলে সংশ্লিষ্ট আমানতকারীকে ব্যাংক রেজল্যুশন স্কিমের আওতায় থাকতে হবে। অন্যদিকে কারেন্ট ও সেভিংস হিসাবের আমানতকারীরা একবারে মূল টাকা মুনাফাসহ তুলতে পারবেন।
ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে ৭ সেপ্টেম্বর। প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রাহকেরা তাদের হিসাবে থাকা সম্পূর্ণ মূল অর্থ এককালীন উত্তোলন বা নগদায়ন করতে পারবেন। তবে এতে কোনো মুনাফা যুক্ত হবে না। এ জন্য আজ থেকেই ব্যাংকের শাখাগুলোতে আবেদন নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর থেকেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি হিসাবগুলোতে স্বাভাবিক লেনদেন চালুর কথা রয়েছে। তবে শাখা ও উপশাখায় প্রয়োজনীয় নগদ অর্থের চাহিদাপত্র পাঠানো, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নগদ অর্থের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নিরাপদে নগদ ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে কয়েক দিন সময় লাগছে। এ কারণে ৭ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতের অর্থ ফেরতের কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু করা হবে।
কী অবস্থায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সংকটে পড়া পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। ব্যাংক পাঁচটি হলো—এস আলম গ্রুপ নিয়ন্ত্রিত ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক এবং আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রিত এক্সিম ব্যাংক।
গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে ব্যাংকগুলো ব্যর্থ হওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এগুলো একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠন করে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে শতভাগ সরকারি মালিকানাধীন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর মোট ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের সঞ্চয়ী হিসাবে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, পাঁচ ব্যাংকের মোট ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকার ঋণের প্রায় ৮৬ শতাংশই এখন খেলাপি। ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির পরিমাণও ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
গত বছরের নভেম্বরে সরকারি মালিকানায় যাত্রা শুরু করা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়ার কথা রয়েছে।
























