JAC EnergyPac Power
Crystal Life Insurance
Share Business Logo
bangla fonts
facebook twitter google plus rss

চামড়া রপ্তানিতে ফিরছে সুদিন


০৭ নভেম্বর ২০২১ রবিবার, ০২:১২  পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক

শেয়ার বিজনেস24.কম


চামড়া রপ্তানিতে ফিরছে সুদিন

তৈরি পোশাকের পর এবার চামড়া রপ্তানির পালেও হাওয়া লেগেছে। দীর্ঘদিন ধরে সংকটে ছিল এ খাতের রপ্তানি। করোনাভাইরাস মহামারিতে সেটায় ধস নেমেছিল। তবে এবার মেঘ কাটতে শুরু করেছে। আবারও সুদিন ফিরে আশার আলো দেখাচ্ছে খাতটি।

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বিদেশি মুদ্রা দেশে এনেছেন এ খাতের রপ্তানিকারকরা। বর্তমান বিনিময় হার হিসাবে (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ৭০ পয়সা) টাকার অঙ্কে এই অর্থের পরিমাণ ৩ হাজার ১২৮ কোটি টাকা, যা গত ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৯ শতাংশ বেশি। আর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১১ শতাংশ বেশি।

আর এই আয়ের ৬২ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকাই এসেছে জুতা রপ্তানি থেকে।

গত বছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে এই খাত থেকে ২৮ কোটি ৩২ লাখ ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ।

রপ্তানিকারকরা আশার কথা শুনিয়ে বলেছেন, তৈরি পোশাকের মতো চামড়া খাতেও প্রচুর অর্ডার আসছে। আগামী দিনগুলোতেও রপ্তানির বর্তমান ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের প্রধান বাজার হচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানসহ আরও কয়েকটি দেশে রপ্তানি হয় এই পণ্য।

মহামারি করোনার কারণে প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে এই দেশগুলো। ছোট-বড় সব ধরনের শপিং মল খুলেছে। মানুষজন এখন পুরোদমে কেনাকাটা করছে। অর্থনীতি আবার গতি ফিরে এসেছে। অন্যান্য পণ্যের মতো চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে। সে কারণেই রপ্তানি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন রপ্তানিকারকরা।

লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে জুতার মোট বাজারের ৫৫ শতাংশ চীনের দখলে। ভারত ও ভিয়েতনামেরও ভালো অবস্থান আছে। বিশ্বে জুতার বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮তম। তবে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের এ খাতে অবদান মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ।

করোনার পর তৈরি পোশাকের মতো চামড়া খাতের রপ্তানিতেও নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। প্রধান রপ্তানিকারক দেশ চীনের কিছু অর্ডার বাংলাদেশে আসতে শুরু করেছে। ভিয়েতনাম থেকেও অর্ডার আসছে। এসব সুযোগ ভালোমতো কাজে লাগাতে পারলে ভবিষ্যতে রপ্তানি আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা।

প্রতিবছর চামড়া খাত থেকে যে বিদেশি মুদ্রা দেশে আসে, তার প্রায় ১৫ শতাংশ রপ্তানি করে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার। প্রতিষ্ঠানটি জার্মানি, ইতালিসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে জুতা রপ্তানি করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাতেও জুতা রপ্তানি শুরু করেছে অ্যাপেক্স।

অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, কয়েক বছর ধরে চামড়া খাতের রপ্তানিতে বেশ খারাপ অবস্থা চলছিল। গত বছর করোনার ধাক্কায় তা আরও নাজুক হয়। তবে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ভালোই যাবে আগামী দিনগুলো।

তিনি বলেন, ‘জুতাসহ চামড়াজাত সব পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। দুই বছর ধরে যারা কোনো জুতা বা চামড়ার পণ্য কেনেনি, তারা এখন কিনছে। সে কারণেই রপ্তানি বাড়ছে।’

আগামী দিনগুলোতে এ খাতের রপ্তানি আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করে নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘সব দেশের সঙ্গে বিমান চলাচল শুরু হয়েছে। বিমানবন্দরগুলোতে অবস্থিত বড় বড় ব্র্যান্ডের দোকানগুলো খুলেছে; লোকজনের যাতায়াত বেড়েছে। বিক্রিও বাড়ছে।’

নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘ভ্রমণের সময় লোকজন চামড়ার তৈরি নানা ধরনের ল্যাগেজ ব্যবহার করে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় সেগুলোরও চাহিদা বেড়েছে।

‘সবকিছু মিলিয়ে চামড়া খাতে আমরা আশার আলো দেখছি। আশা করছি, আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরেই আমরা এ খাত থেকে আগের মতো বিদেশি মুদ্রা আয় করতে পারব।’

তবে সাভার চামড়া শিল্প নগরী নিয়ে ক্রেতারা এখনও খুশি নয় জানিয়ে মেট্রোপলিটন চেম্বারের সাবেক সভাপতি নাসিম মঞ্জুর জানান, সাভার চামড়া শিল্প নগরীর পরিবেশ নিয়ে মোটেই খুশি নয় ক্রেতারা। ওখানকার চামড়া দিয়ে কোনো পণ্য উৎপাদন করলে ক্রেতারা কেনে না। তাই বাধ্য হয়ে শিল্পনগরীর বাইরে তৃতীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঁচামাল কিনে পণ্য উৎপন্ন করে থাকেন রপ্তানিকারকরা।

করোনার পর চামড়া রপ্তানিতে নতুন করে যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, সেটা ধরে রাখতে সাভার শিল্পনগরীর পরিবেশ উন্নয়নে সরকার ও ট্যানারি শিল্পমালিকদের জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান এই শিল্পোদ্যোক্তা।

চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতান বলেন, চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি দামও খানিকটা বেড়েছে। সে কারণেই রপ্তানি আয় বেশি আসছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। অনেক দিন পর চামড়া খাতের রপ্তানিতে ভালো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এই সুযোগটিই আমাদের কাজে লাগাতে হবে। আর যদি সেটা আমরা করতে পারি, তাহলে আমরা এই খাতকে আবার আগের অবস্থায় নিয়ে যেতে পারব।’

জুতা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বে-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের রপ্তানিতে ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। কারণ চীন থেকে সরে কিছু ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে এসেছে। এ ছাড়া ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় লকডাউনে বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় কিছু ক্রয়াদেশ এ দেশে এসেছিল। নতুন কিছু ক্রেতাও বাংলাদেশে এসেছে। এরা ভবিষ্যতেও ক্রয়াদেশ দেবে। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রে চাহিদা বাড়ছে। সব মিলিয়ে আগামী দিনগুলোতে ক্রয়াদেশ বাড়বে বলে আশা করা যায়।’

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে ১১৩ কোটি ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ১১৬ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই আয় আরও বেড়ে হয় ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে চামড়াশিল্প থেকে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয়।

এরপর থেকেই ধস নামে এ খাতের রপ্তানিতে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা ১০৮ কোটি ৫৪ লাখ ডলারে নেমে আসে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা আরও কমে ১০২ কোটি ডলারে নামে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা আরও কমে ৭৯ কোটি ৭৬ লাখ ডলারে নেমে আসে।

মহামারির মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে ৯৪ কোটি ১৭ লাখ ডলারের বিদেশি মুদ্রা দেশে এনেছেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। টাকার হিসাবে এই অর্থের পরিমাণ ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। আগের বছরের চেয়ে রপ্তানি বেড়েছিল ১৮ শতাংশ। অর্থবছরের প্রথম ভাগে এ খাতের রপ্তানিতে ধস নামলেও দ্বিতীয় ভাগে এসে তা ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রবৃদ্ধিতে ফিরে আসে।

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের শুরু থেকেই চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা লক্ষ করা যায়।

প্রতি মাসেই বেড়েছে রপ্তানি। সর্বশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) এ খাতের রপ্তানি থেকে ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার দেশে এসেছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৯ শতাংশ; লক্ষ্যের চেয়ে আয় প্রায় ১১ শতাংশ।

এই আয়ের ৬২ শতাংশই এসেছে চামড়ার জুতা রপ্তানি থেকে। ৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলার এসেছে চামড়া দিয়ে তৈরি ব্যাগ, লাগেজ, মানিব্যাগ, বেল্টসহ অনান্য পণ্য রপ্তানি করে।

কাঁচা ও ওয়েট-ব্লু চামড়া রপ্তানি করে এই চার মাসে আয় হয়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ডলার।

গত বছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে এই খাত থেকে ২৮ কোটি ৩২ লাখ ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ।

চামড়া খাতকে একসময় সম্ভাবনাময় মনে করা হলেও এটি ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যাচ্ছিল। দ্বিতীয় শীর্ষ এই রপ্তানি খাত এখন চতুর্থ স্থানে নেমে এসেছে।

রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে চামড়াশিল্প নগরী সাভারে স্থানান্তর নিয়ে দীর্ঘ জটিলতার কারণেই এ শিল্পের এই হাল বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে ২০০৩ সালে হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্পনগরী সাভারে স্থানান্তরে প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। তিন বছরের মধ্যে প্রকল্প শেষের কথা ছিল। কিন্তু দেড় যুগ শেষ হতে চললেও এই শিল্পনগরী এখনও পরিবেশবান্ধব হয়ে ওঠেনি।

প্রকল্প শেষ না হলেও ২০১৭ সালে উচ্চ আদালত হাজারীবাগের চামড়া কারখানা বন্ধের ঘোষণা দেয়। ফলে সব কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে বেশ কিছু চামড়া কারখানার বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ ছিল। এ সনদের সুবাদে তারা জাপান, কোরিয়াসহ ইউরোপ-আমেরিকায় চামড়া রপ্তানি করতে পারত। হাজারীবাগে কারখানা বন্ধ হওয়ায় সেই সনদ ও বায়ার (বিদেশি ক্রেতা) হারায় চামড়াশিল্প কারখানাগুলো।

এত দীর্ঘ সময়েও সাভারের চামড়া শিল্প নগরী পূর্ণাঙ্গভাবে প্রস্তুত না হওয়ায় এখনও এলডব্লিউজির সনদ ফিরে পায়নি কারখানাগুলো। একই সঙ্গে নতুন বাজার সৃষ্টি হয়নি।

সনদ না থাকায় জাপান, কোরিয়াসহ ইউরোপ-আমেরিকায় এলডব্লিউজির আওতায় চামড়া রপ্তানি করতে পারছে না কারখানাগুলো।

আর এ বিধি-নিষেধের কারণে এসব কারখানা থেকে কাঁচামাল নিয়ে পণ্য উৎপন্ন করে সে পণ্য রপ্তানিও করতে পারছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো।

অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘এখন যে সুযোগটি আমাদের এসেছে, সেটা যদি হাতছাড়া হয়ে যায় তাহলে হয়তো আমাদের চামড়া শিল্প আর কোনো দিনই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। তাই সরকারের প্রতি আমার অনুরোধ, সাভার চামড়া শিল্পনগরীকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে যা কিছু করা প্রয়োজন, তাই যেন করা হয় এবং তা যেন দ্রুততর সময়ের মধ্যে করা হয়।’

মহামারির মধ্যেও গত অর্থবছরে তৈরি পোশাক শিল্প খাত থেকে আগের বছরের চেয়ে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি আয় দেশে এসেছে। আর চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ।

শেয়ারবিজনেস24.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:

অর্থ ও বাণিজ্য -এর সর্বশেষ