শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ফার্স্ট ফাইন্যান্স পিএলসি-এর ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক। প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক উচ্চ হার, তারল্য সংকট, নেতিবাচক মূলধন, কর বকেয়া এবং চলমান প্রতিষ্ঠান (Going Concern) হিসেবে টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কাজী জহির খান অ্যান্ড কোং, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস তাদের প্রতিবেদনে Qualified Opinion, Emphasis of Matter, Other Matters এবং Material Uncertainty যুক্ত করেছে। নিরীক্ষকের মতে, কোম্পানির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম অনেকটাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার সহায়তা ও পুনর্গঠন কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানির মোট ঋণ ও লিজ পোর্টফোলিওর ৮৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি। আদালতের স্থগিতাদেশে ৫৮ কোটি ১৬ লাখ টাকার কিছু ঋণ অশ্রেণিকৃত রাখা হয়েছে। এ সুবিধা না থাকলে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৯৬ দশমিক ০৩ শতাংশে পৌঁছাত। এছাড়া পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠিত ঋণের বড় অংশও এখনো খেলাপি অবস্থায় রয়েছে।
নিরীক্ষক আরও জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ছাড়ের আওতায় ৪৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ঋণ ক্ষতি সংরক্ষণ (Loan Loss Provision) স্থগিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানির প্রকৃত আমানত দায় আর্থিক বিবরণীতে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, বকেয়া ঋণ আদায়ে কোম্পানিকে ৯৭৫টি মামলা করতে হয়েছে। এসব মামলার আওতায় থাকা ঋণের পরিমাণ ৬৪৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, যা মোট ঋণ পোর্টফোলিওর ৮৬ দশমিক ৬০ শতাংশ।
এদিকে কোম্পানির ৩৯ কোটি ৬৩ লাখ টাকা উৎসে কর এবং ৪৩ লাখ টাকা ভ্যাট ও আবগারি শুল্ক নির্ধারিত সময়ে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। এ কারণে ভবিষ্যতে জরিমানা, সুদ ও আইনি জটিলতার ঝুঁকি রয়েছে বলে নিরীক্ষক উল্লেখ করেছেন।
তারল্য সংকটও প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বড় সমস্যা। বর্তমানে ৩০৬ কোটি ৯১ লাখ টাকার মেয়াদোত্তীর্ণ আমানত উচ্চ সুদ বহন করছে। জমাকৃত সুদের পরিমাণ বেড়ে ১১৩ কোটি ৭ লাখ টাকা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে কোম্পানির ঋণ দাঁড়িয়েছে ১২৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা।
মূলধন পর্যাপ্ততার ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতির তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ মূলধন পর্যাপ্ততার (CRAR) বিপরীতে কোম্পানির CRAR ঋণাত্মক ৭১ দশমিক ১৮ শতাংশ। ফলে টিয়ার-১ মূলধনে ৫৯১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
নিরীক্ষক আরও উল্লেখ করেন, কোম্পানির কোর বিজনেস সল্যুশন (CBS) সফটওয়্যারে তথ্য সমন্বয় ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা রয়েছে। এছাড়া শ্রম আইন অনুযায়ী Workers Profit Participation Fund (WPPF) ও Workers Welfare Fund (WWF) গঠন না করার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে Material Uncertainty অংশে নিরীক্ষক বলেছেন, ২০২৫ সালে কোম্পানির নিট সুদ আয়, পরিচালন আয় এবং পরিচালন নগদ প্রবাহ—সবই ঋণাত্মক ছিল। একই সঙ্গে শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটি ঋণাত্মক ৫৪৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ২০১৭ সাল থেকে চলমান তারল্য সংকট, উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির Going Concern হিসেবে টিকে থাকা উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। তবে এ কারণে নিরীক্ষক তার মূল মতামত পরিবর্তন করেননি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসা এসব তথ্য স্বল্পমেয়াদে ফার্স্ট ফাইন্যান্সের শেয়ার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানে রাখতে পারে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সহায়তা, মূলধন পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ আদায়ে অগ্রগতি এবং তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ধীরে ধীরে ফিরতে পারে।
























