দেশের শেয়ারবাজারকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বাজার সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (১৮ জানুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি’র মাল্টিপারপাস হলে বেলা সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠিত হয় ৫ম মাসিক সমন্বয় সভা।
সভায় শেয়ারবাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি আইনি সংস্কার, কাঠামোগত উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত ও উন্মুক্ত আলোচনা হয়।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের গঠিত কমিটির সভাপতি এবং মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী শেয়ারবাজারের বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দ্রুত দূর করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধানে সব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নিয়মিত এই ধরনের সমন্বয় সভাকে তিনি একটি কার্যকর মেকানিজম হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা গেলেই বাজারের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।
২০২৫ সালে চলমান সংস্কার কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি দ্রুত সমস্যা সমাধান করে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণের নির্দেশনা দেন।
সভায় বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ কমিশনের পক্ষ থেকে গৃহীত বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ তুলে ধরেন। তিনি জানান, শেয়ারবাজারের আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করতে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’, ‘মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা, ২০২৫’ এবং ‘পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ রুলস, ২০২৫’—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা ২০২৫ সালের মধ্যেই সফলভাবে প্রণয়ন সম্পন্ন হয়েছে।
আইপিওকে শেয়ারবাজারের ‘হৃৎপিণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, নতুন পাবলিক অফার রুলসের ফলে বাজারে মানসম্মত কোম্পানির শেয়ার আসার পথ সুগম হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে এই আইনি কাঠামোর যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে বাজারের গভীরতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বাজার সংস্কারে প্রধান উপদেষ্টা ও অর্থ উপদেষ্টার ধারাবাহিক সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
সভায় শেয়ারবাজার আধুনিকায়নে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
শেয়ারবাজার উন্নয়নে ৫ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ
বাজারে বৈচিত্র্য আনতে নতুন পণ্য ও ইনস্ট্রুমেন্ট প্রবর্তন
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে রোড শো আয়োজন
ই-কেওয়াইসি চালুর মাধ্যমে অনলাইনে দ্রুত বিও হিসাব খোলা
বাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এপিআই কানেকটিভিটি বৃদ্ধি
এছাড়া দ্রুত কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু, সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল)-এর রেজিস্ট্রেশন ও অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু এবং মার্জার ও একুইজিশন (এমঅ্যান্ডএ) প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করার বিষয়েও ঐকমত্য হয়।
বাজারের গভীরতা বাড়াতে রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা ও আস্থা ফেরাতে করপোরেট সুশাসন জোরদার এবং মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর ভূমিকা সম্প্রসারণের প্রস্তাবও উঠে আসে।
বিশেষভাবে বিনিয়োগ শিক্ষা প্রসারে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করার নতুন পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। এর অংশ হিসেবে দেশব্যাপী সচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে পাক্ষিক ভিত্তিতে বিনিয়োগ শিক্ষা বিষয়ক বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারের উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়।
সভায় বিএসইসি কমিশনার মুহাম্মদ মোহসিন চৌধুরী, মো. আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ ও মো. সাইফুদ্দিন, কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম ও এমডি নুজহাত আনোয়ার, সিসিবিএল চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. ওয়াহিদ-উজ-জামান, ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম, আইসিবি এমডি নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ, সিডিবিএল এমডি মো. আবদুল মোতালেবসহ চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ ও বিএমবিএ’র শীর্ষ প্রতিনিধিরা মতামত দেন।
সভা শেষে বিএসইসি চেয়ারম্যান শেয়ারবাজারের টেকসই সংস্কার ও উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি ধন্যবাদ জানান এবং বাজারে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কমিশনের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
























