অনিশ্চিত সূচক, দীর্ঘস্থায়ী লেনদেনের স্থবিরতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে শেয়ারবাজার থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)–এর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরের মধ্যে শেয়ারবাজার থেকে সরকারি আয় নেমে এসেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
শেয়ার কেনাবেচার ওপর আরোপিত কর থেকেই মূলত এই রাজস্ব সংগ্রহ করা হয়। ফলে বাজারে দীর্ঘদিন ধরে লেনদেনের মন্দাভাব সরাসরি প্রভাব ফেলেছে সরকারের রাজস্ব আয়ে।
ডিএসইর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সরকার শেয়ারবাজার থেকে রাজস্ব আদায় করেছে মাত্র ১১২ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এই আয় ছিল ১৫৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব কমেছে প্রায় ৪১ কোটি টাকা, যা প্রায় ২৫ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে।
তুলনামূলকভাবে, কোভিড-পরবর্তী বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও ২০২১–২২ অর্থবছরে শেয়ারবাজারে লেনদেনের জোয়ার থাকায় সরকার আদায় করেছিল ২৮৬ কোটি টাকা রাজস্ব। সে বছর ডিএসইতে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা, আর দৈনিক গড় লেনদেন ছাড়িয়েছিল ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
কিন্তু সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে ডিএসইতে মোট লেনদেন নেমে এসেছে মাত্র ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকায়। একই সময়ে দৈনিক গড় লেনদেন কমে দাঁড়িয়েছে ৫২২ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ কম।
গত বছরের আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সাময়িক আশাবাদ তৈরি হয়। সে সময় ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স উঠেছিল ৬ হাজার ১৬ পয়েন্টে, এবং কোনো কোনো দিনে লেনদেন ছাড়িয়েছিল ২ হাজার কোটি টাকা। তবে এই ইতিবাচক ধারা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর দুর্বল মুনাফা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণে বাজার আবারও নিম্নমুখী হয়ে পড়ে। মে মাসের শেষ দিকে সূচক নেমে আসে ৪ হাজার ৬১৫ পয়েন্টে। অর্থবছর শেষে সূচক দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮৩৮ পয়েন্টে, যা বছরে প্রায় ৯ শতাংশ পতনের ইঙ্গিত দেয়।
বিনিয়োগকারীদের নতুন করে পুঁজি বিনিয়োগে অনীহায় লেনদেন আরও স্থবির হয়ে পড়ে। বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় শেয়ারবাজারের বাজারমূলধনের অনুপাত নেমে এসেছে মাত্র ১২ শতাংশে, যা দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় পুঁজিবাজারের দুর্বল অবস্থানকে স্পষ্ট করে।
এ বিষয়ে একটি ব্রোকারেজ হাউসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন,
“শেয়ারবাজার সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাজারে যত বেশি শেয়ার কেনাবেচা হবে, সরকারের আয় তত বাড়বে। কিন্তু গত অর্থবছরে কার্যত বাজারে কোনো গতি না থাকায় রাজস্ব আদায় তলানিতে নেমে এসেছে।”
তিনি আরও বলেন, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে সরকারের এই রাজস্ব প্রবাহ আবারও স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে পারে।
























