ঢাকা   রোববার ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩

বারবার ছাড়ে ঋণ পরিশোধের আগ্রহ কমছে, খেলাপি ঋণ আবার ৬ লাখ কোটি ছাড়াল

অর্থ ও বাণিজ্য

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:২৫, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

বারবার ছাড়ে ঋণ পরিশোধের আগ্রহ কমছে, খেলাপি ঋণ আবার ৬ লাখ কোটি ছাড়াল

ঋণখেলাপিদের বারবার নীতিগত ছাড় দেওয়ার কারণে ব্যাংকিং খাতে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। একের পর এক পুনঃতফসিল, এককালীন ঋণ পরিশোধের সুযোগসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আবারও ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। বিতরণ করা মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার এখন ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি গিয়ে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় উঠেছিল। ওই সময় বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশই খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়।

বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণ খেলাপিতে চাপ বাড়ে

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ওই সময়ে এস আলম গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বেক্সিমকো, সিকদার গ্রুপসহ তৎকালীন সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে আলোচিত কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিপুল ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ে।

এর প্রভাবেই গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। মাত্র ছয় মাস আগে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুনে এ পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণের এই চাপ কমাতে অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিভিন্ন নীতিগত সুবিধা দিয়েছে। এর মধ্যে তুলনামূলক সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিল এবং ‘ওয়ান-টাইম এক্সিট’ বা এককালীন নিষ্পত্তির সুযোগও রয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগের পরও খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থামেনি।

ডাউন পেমেন্ট দেওয়ার সক্ষমতাও নেই অনেকের

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, অনেক ঋণগ্রহীতার কাছে পুনঃতফসিলের জন্য প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট দেওয়ার মতো অর্থও নেই। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত নীতির আওতায় ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদন বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলো সমস্যায় পড়ছে।

তিনি জানান, কিছু ঋণগ্রহীতা আরও সময় চেয়ে আবেদন করেছেন। এ কারণে পুনঃতফসিলের বেশ কিছু আবেদন এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

এর মধ্যে ঋণের ওপর নিয়মিত সুদ জমা হচ্ছে। সেই সুদের অর্থও পরবর্তী সময়ে খেলাপি ঋণের মোট হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বলে জানান তিনি।

পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ

ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বিপুল খেলাপি ঋণের প্রেক্ষাপটে সংকটাপন্ন পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেয় সরকার। ব্যাংকগুলো হলো—এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

এক্সিম ব্যাংক ছাড়া বাকি চারটির পরিচালনা পর্ষদে এস আলম গ্রুপের প্রভাব ছিল। পরে পাঁচটি ব্যাংককে একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা হয়েছে।

বড় খেলাপিদের ঋণ আদায়ে হিমশিম ব্যাংক

একটি বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বড় অংশের পেছনে বিগত সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বড় ঋণগ্রহীতার ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের অনেকেই বর্তমানে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে নেই। ফলে ব্যাংকগুলোর পক্ষে ওই ঋণ আদায় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তাঁর মতে, সব ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ না করে পরিস্থিতি ও গ্রাহকের সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো গ্রাহক ৫ টাকা ঋণ নেওয়ার পর সুদসহ সেটি বেড়ে ১৫ টাকা হলে এবং তা দীর্ঘদিন অনাদায়ী থাকলে, ব্যাংক চাইলে পুরো ১৫ টাকা আদায়ের পরিবর্তে ৮ টাকায় নিষ্পত্তির বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।

তাঁর মতে, সুদের একটি অংশ মওকুফ করার পাশাপাশি পরিশোধের জন্য কিছুটা সময় দেওয়ার সুযোগ না থাকলে ‘ওয়ান-টাইম এক্সিট’ নীতিতে প্রত্যাশিত সাড়া নাও মিলতে পারে। কারণ অনেক ঋণগ্রহীতার পক্ষেই একসঙ্গে পুরো অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব নয়।

ঋণ আদায়ে বাস্তবভিত্তিক পদ্ধতির পরামর্শ

ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা ও পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোকে আলাদা কৌশল নিতে হয়। কোনো ক্ষেত্রে সুদ ছাড় দেওয়া যেতে পারে, আবার কোনো ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। প্রয়োজনে ঋণ আদায়ের জন্য সম্পদ বিক্রির পথও বেছে নিতে হয়।

তাঁর মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান এবং সুশাসনের নীতির মধ্যে থেকেই ব্যাংকারদের ঋণ আদায়ে আরও সক্রিয় হতে হবে। প্রচলিত পদ্ধতিতে কাজ করে ফল না এলে বাস্তবতা বিবেচনায় বিকল্প ও কার্যকর পন্থাও অনুসরণ করতে হবে।

তিনি বলেন, এমন সমাধান বেছে নেওয়া জরুরি, যা শুধু ঋণ আদায়ের পরিমাণ বাড়াবে না; একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মূল্যও ধরে রাখবে এবং ব্যাংক, আমানতকারী, ঋণগ্রহীতা ও অন্যান্য অংশীজনের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবে।

বারবার ছাড়ে তৈরি হচ্ছে ভুল প্রত্যাশা

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, একই শ্রেণির ঋণখেলাপিদের বারবার ছাড় দেওয়ার ফলে বাজারে নেতিবাচক বার্তা গেছে। এতে অনেক ঋণগ্রহীতার মধ্যে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে যে, পরবর্তী সময়েও ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানো হতে পারে এবং প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট না দিয়েও তারা সুবিধা পেয়ে যাবেন।

তিনি বলেন, ওয়ান-টাইম এক্সিট, ঋণ অবলোপনসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সুবিধা বারবার দেওয়ার কারণে ব্যাংকিং খাত ইতোমধ্যে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

তাঁর মতে, খেলাপি ঋণের হার যখন প্রায় ৩২ শতাংশে পৌঁছে গেছে, তখনও যদি নিয়ন্ত্রক ছাড় অব্যাহত থাকে, সেটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

জাহিদ হোসেন বলেন, বারবার ছাড় দেওয়ার পথ থেকে সরে এসে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে যে একই ধরনের সুবিধা অনির্দিষ্টকাল দেওয়া হবে না। তা না হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পদ্ধতিগত ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আর্থিক স্থিতিশীলতা ও মূল্যস্থিতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সর্বশেষ