আইপিওর মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যয় না করে ৮১ কোটি টাকা দিয়ে অন্য একটি কোম্পানির ৯৯ শতাংশ মালিকানা কেনার অভিযোগে রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলসের পাঁচ পরিচালককে মোট ১০০ কোটি টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কোম্পানিটির আইপিও অনুমোদনের শর্ত ও সংশ্লিষ্ট আইন লঙ্ঘনের দায়ে প্রত্যেক পরিচালককে ২০ কোটি টাকা করে এ অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি কমিশন এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জরিমানার অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ২০ কর্মদিবসের মধ্যে। এই সময়সীমা অতিক্রম করলে প্রত্যেক পরিচালকের ক্ষেত্রে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা করে অতিরিক্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আদেশ জারির পর ইতোমধ্যে ১০ কর্মদিবস পেরিয়ে গেছে। তবে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
জরিমানার আওতায় আসা পাঁচ পরিচালক হলেন রিজেন্ট টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান হাবীব এবং পরিচালক ইয়াছিন আলী, তানভির হাবীব ও মাশরুফ হাবীব। তারা সবাই চট্টগ্রামভিত্তিক হাবীব গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
এর আগে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের প্রায় ৪২ কোটি টাকা ঋণখেলাপির ঘটনায় ২০২২ সালে তাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত।
আইপিওতে সংগ্রহ করা হয়েছিল ১২৫ কোটি টাকা
বস্ত্র খাতের তালিকাভুক্ত রিজেন্ট টেক্সটাইল ২০১৫ সালে পুঁজিবাজারে আসার সময় আইপিওর মাধ্যমে ১২৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার ২৫ টাকা দরে বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হয়।
আইপিওর অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনায় কারখানা আধুনিকায়নে প্রায় ৮২ কোটি টাকা এবং নতুন একটি পোশাক কারখানা স্থাপনে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেছিল কোম্পানিটি। এসব নির্ধারিত উদ্দেশ্য বিবেচনায় নিয়েই আইপিওর অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ২০১৯ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটির কাছে প্রায় ৮৩ কোটি টাকা অব্যবহৃত থাকার পর সেখান থেকে ৮১ কোটি টাকা ব্যয় করে লিগ্যাসি ফ্যাশনস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ৯৯ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করা হয়।
একই মালিকানার প্রতিষ্ঠানে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ
বিএসইসির জরিমানার আদেশে বলা হয়েছে, রিজেন্ট টেক্সটাইল ও লিগ্যাসি ফ্যাশনসের মালিকানায় একই ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। কমিশনের তদন্তে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্বার্থের সংঘাত এবং অভিন্ন মালিকানার সম্পর্কের তথ্য পাওয়া গেছে।
দুই কোম্পানির নিবন্ধিত ঠিকানাও একই—চট্টগ্রামের ২২০ স্ট্র্যান্ড রোড।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ইয়াকুব আলী, ইয়াসিন আলী এবং প্রয়াত মাহবুব আলীর পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত মালিকানায় রিজেন্ট টেক্সটাইলের ৫৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ শেয়ার ছিল। একই পরিবারের সদস্যদের মালিকানায় ছিল লিগ্যাসি ফ্যাশনসের শতভাগ শেয়ার।
ইয়াকুব আলী ও ইয়াসিন আলী দুই প্রতিষ্ঠানের পর্ষদেই দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাশাপাশি ইয়াসিন আলী লিগ্যাসি ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বেও ছিলেন।
বিএসইসির তদন্ত অনুযায়ী, দুই প্রতিষ্ঠানের অভিন্ন মালিকানা ও স্বার্থসংশ্লিষ্টতার বিষয়টি গোপন রেখে আইপিও থেকে সংগৃহীত অর্থ লিগ্যাসি ফ্যাশনসে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
সুদসহ ৯০ কোটি টাকা ফেরতের নির্দেশও ছিল
আইপিও তহবিলের অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর গত বছরের ১৪ জানুয়ারি রিজেন্ট টেক্সটাইলকে ওই অর্থ সুদসহ প্রায় ৯০ কোটি টাকা কোম্পানির হিসাবে ফেরত আনার নির্দেশ দিয়েছিল বিএসইসি।
তবে কমিশনের ওই নির্দেশ বাস্তবায়নে কোম্পানির পর্ষদ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে জরিমানার আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অর্থ ব্যবহারের অনিয়ম এবং আইপিও শর্ত ভঙ্গের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরিচালকদের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানার সিদ্ধান্ত নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
আর্থিক প্রতিবেদনে আরও অনিয়মের তথ্য
বিএসইসির পর্যালোচনায় রিজেন্ট টেক্সটাইলের আর্থিক প্রতিবেদনেও বিভিন্ন অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। ২০১৯ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে কোম্পানিটি ১৩৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা ‘ক্যাপিটাল ওয়ার্ক ইন প্রগ্রেস’ হিসেবে দেখায়।
তবে নির্ধারিত হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী ওই অর্থ পরবর্তীতে প্রপার্টি, প্ল্যান্ট অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট হিসেবে স্থানান্তর করা হয়নি। কমিশনের মতে, এ ধরনের হিসাব উপস্থাপন বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এ ছাড়া কোম্পানিটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান রিজেন্ট ফ্যাব্রিকসের সঙ্গে ২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং রিজেন্ট উইভিংয়ের সঙ্গে ১১ কোটি ৯২ লাখ টাকার অননুমোদিত লেনদেনের তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক তথ্য প্রকাশে ঘাটতি
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর রিজেন্ট টেক্সটাইল সর্বশেষ ২০২০ সালে শেয়ারহোল্ডারদের ১ শতাংশ নগদসহ মোট ২ শতাংশ লভ্যাংশ দেয়। এরপর থেকে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে ধারাবাহিকতা নেই।
২০২৩ সালের জুনের পর স্টক এক্সচেঞ্জকেও কোম্পানিটি আর কোনো তথ্য দেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার রিজেন্ট টেক্সটাইলের শেয়ার ৬ টাকা ২০ পয়সায় লেনদেন হয়েছে। একপর্যায়ে শেয়ারটির বাজারদর নেমে এসেছিল ১ টাকা ৩০ পয়সায়।




















