ঢাকা   রোববার ১৯ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

দুই-তিন মাসেই ঘুরে দাঁড়াবে শেয়ারবাজার? বড় আশার কথা জানালেন বিএসইসি চেয়ারম্যান

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬:৫৭, ১৮ জুলাই ২০২৬

দুই-তিন মাসেই ঘুরে দাঁড়াবে শেয়ারবাজার? বড় আশার কথা জানালেন বিএসইসি চেয়ারম্যান

দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট, অনিয়ম ও দুর্বল সুশাসনের কারণে যখন দেশের শেয়ারবাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের হতাশা বাড়ছে, ঠিক তখনই বড় আশার কথা জানালেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তার দাবি, প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়াতে পারে দেশের শেয়ারবাজার।

শনিবার (১৮ জুলাই) বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি) মিলনায়তনে ‘পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট নিরসনে করণীয়’ শীর্ষক এক ছায়া সংসদ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, শেয়ারবাজারকে বিনিয়োগবান্ধব ও আকর্ষণীয় করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তার ভাষায়, “আমরা যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছি, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। এটা হতেই হবে।”

রোড শো নয়, বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হবে বাজারের পরিবেশ দিয়ে

বিদেশি বিনিয়োগ আনার প্রসঙ্গে মাসুদ খান বলেন, শুধু রোড শো আয়োজন করলেই বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। বরং শেয়ারবাজারকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিজেরাই এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী হন।

বাজারের গভীরতা বাড়াতে বড় ও সুনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এ লক্ষ্যে প্রচলিত আইপিও পদ্ধতির পাশাপাশি ডিরেক্ট লিস্টিংকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।

তার মতে, বিকাশ বা বড় ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো দীর্ঘ আইপিও প্রক্রিয়ার পরিবর্তে সীমিত পরিমাণ শেয়ার ছেড়ে দ্রুত পুঁজিবাজারে আসার সুযোগ পেতে পারে।

আইপিওতে এক থেকে দেড় বছরের দীর্ঘসূত্রতা

বর্তমান আইপিও প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে বলেও স্বীকার করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, অডিটেড আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও অতিরিক্ত নথিপত্র চাওয়ার কারণে কোনো কোনো কোম্পানির আইপিও অনুমোদনে এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

এই জটিলতা কমাতে ফরেনসিক অডিট চালুর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এর মাধ্যমে কোম্পানির সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, আয়-ব্যয় ও দায়-দেনাসহ আর্থিক তথ্যের পূর্ণাঙ্গ যাচাই করা সম্ভব হবে। এতে আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও সময়সাশ্রয়ী হবে বলে মনে করছেন তিনি।

বহুজাতিক কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে নতুন উদ্যোগ

দেশের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কেন শেয়ারবাজারে আসছে না—এ প্রসঙ্গে মাসুদ খান বলেন, ব্যবসায়িক গোপনীয়তা রক্ষা, প্রযুক্তিগত তথ্য প্রকাশ এবং স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতা অনেক প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্তিতে নিরুৎসাহিত করে।

তবে এসব প্রতিবন্ধকতা কমিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে নতুন নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

একীভূত ব্যাংকের মূল্য নির্ধারণে বড় চ্যালেঞ্জ

ব্যাংক একীভূতকরণ প্রসঙ্গে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, এটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং এ বিষয়ে প্রধান নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে একীভূত হতে যাওয়া অনেক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি এবং ইকুইটি নেতিবাচক হওয়ায় প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ অবস্থায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর সমাধান প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ব্রোকারেজ হাউজে অনিয়ম ঠেকাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা

বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ ও ব্রোকারেজ হাউজের অনিয়ম ঠেকাতে নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালুর কথাও জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) নতুন ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারের মাধ্যমে অনুমোদন ছাড়া কোনো বিনিয়োগকারীর মোবাইল নম্বর বা ই-মেইল পরিবর্তন করা যাবে না। পাশাপাশি ঝুঁকিভিত্তিক নিয়মিত অডিটের মাধ্যমে বিশেষ করে ছোট ব্রোকারেজ হাউজগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হবে।

মাসুদ খান বলেন, কমিশন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, সামগ্রিক বাজারের স্বার্থে কাজ করবে। গুজব ও কারসাজির ফাঁদে পড়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্য বিনিয়োগকারী শিক্ষা কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আশ্বাসের পর এখন প্রশ্ন বাস্তবায়ন নিয়ে

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিনের কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে শেয়ারবাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

তার মতে, এই সংকট কাটাতে শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার নয়, প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার নিশ্চয়তা।

ফলে বিএসইসি চেয়ারম্যানের দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর আশাবাদ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করলেও এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ঘোষিত সংস্কার ও উদ্যোগগুলো বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয়। কারণ, দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট শুধু আশ্বাসে নয়, দৃশ্যমান সংস্কার ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমেই কাটাতে হবে।