শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের প্রতিষ্ঠান এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ (Emphasis of Matter) করেছেন নিরীক্ষকরা। যদিও ব্যাংকটির আর্থিক বিবরণীর ওপর নিরীক্ষকদের মতামত শর্তহীন রয়েছে, তবে প্রভিশন ঘাটতি, লিজ হিসাবায়ন, কর্মচারী সুবিধা দায় এবং মূলধন পর্যাপ্ততা নিয়ে গুরুতর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।
ব্যাংকটির নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেন মাহমুদ সবুজ অ্যান্ড কোং-এর ব্যবস্থাপনা অংশীদার মো. মাহমুদ হোসাইন এফসিএ এবং সাইফুল শামসুল আলম অ্যান্ড কোং-এর অংশীদার মো. এমরান হোসেন এফসিএ। তাদের প্রতিবেদনে চারটি বিষয়ে বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
১,০০৬ কোটি টাকার প্রভিশন স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিআরপিডি সার্কুলার অনুযায়ী ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে এনআরবিসি ব্যাংকের ১ হাজার ৬ কোটি ১১ লাখ টাকার প্রভিশন সংরক্ষণ করার প্রয়োজন ছিল। তবে ব্যাংকটি ওই প্রভিশন আর্থিক বিবরণীতে স্বীকৃতি দেয়নি।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএসডি-৬/উইং-৪/এনআরবিসি/২০২৬-৩৩১ নম্বর চিঠির মাধ্যমে ৩০ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত এই প্রভিশন স্বীকৃতি স্থগিত রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইএফআরএস-১৬ অনুযায়ী লিজ হিসাবায়নে অসঙ্গতি
নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন, ব্যাংকটি আর্থিক বিবরণীতে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (IFRS-16) অনুসরণের দাবি করলেও বাস্তবে লিজ হিসাবায়নের ক্ষেত্রে মানদণ্ডের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
ব্যাংকটি ১৭টি শাখার ক্ষেত্রে লিজ হিসাবায়ন প্রয়োগ করলেও রাইট-অব-ইউজ (ROU) সম্পদ এবং লিজ দায় নির্ধারণে আইএফআরএস-১৬ এর ২৪ ও ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটি ৩০ দশমিক ৩৯ কোটি টাকার ROU সম্পদ এবং ৩০ দশমিক ১৭ কোটি টাকার লিজ দায় দেখিয়েছে। তবে নিরীক্ষকদের মতে, প্রকৃত পরিমাণ হওয়া উচিত ছিল যথাক্রমে ১২ দশমিক ৪৮ কোটি এবং ১৩ দশমিক ৫৯ কোটি টাকা।
এছাড়া বাকি শাখাগুলোতে আইএফআরএস-১৬ প্রয়োগ না করায় ROU সম্পদ ৭৪ দশমিক ৯০ কোটি টাকা এবং লিজ দায় ৭৮ দশমিক ১৭ কোটি টাকা কম দেখানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্র্যাচুইটি হিসাবায়নে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ হয়নি
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এনআরবিসি ব্যাংক একটি ডিফাইন্ড বেনিফিট গ্র্যাচুইটি স্কিম পরিচালনা করলেও আন্তর্জাতিক হিসাব মান IAS-19 (Employee Benefits) অনুযায়ী বাধ্যতামূলক অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন সম্পন্ন করা হয়নি।
পরিবর্তে ব্যাংকটি চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে প্রভিশন নির্ধারণ করেছে, যা আইএএস-১৯-এর স্বীকৃতি ও পরিমাপসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করে না।
নিরীক্ষকদের মতে, এর ফলে কর্মচারী সুবিধা সংক্রান্ত দায়ের বিপরীতে স্বীকৃত প্রভিশনের প্রকৃত পরিমাণ আর্থিক বিবরণীতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নোটে দেওয়া তথ্যও আইএএস-১৯-এর প্রকাশসংক্রান্ত শর্তের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মূলধন পর্যাপ্ততায় ঘাটতি
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ব্যাংকটির মূলধন পর্যাপ্ততা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৪ সালের ১৮ নম্বর বিআরপিডি সার্কুলার অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর একক ও সমন্বিত ভিত্তিতে ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ মোট মূলধন এবং ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফার (CCB) বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।
কিন্তু ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এনআরবিসি ব্যাংকের মোট মূলধন ও সিসিবি অনুপাত একক ভিত্তিতে ছিল ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং সমন্বিত ভিত্তিতে ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে।
নিরীক্ষকদের মতে, এটি ব্যাংকটির মূলধন পর্যাপ্ততায় ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি এই ঘাটতির কারণে একক গ্রাহক ঋণসীমা (Single Borrower Exposure Limit) এবং বৃহৎ ঋণসীমা (Large Loan Limit) সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু বিধানও যথাযথভাবে প্রতিপালন করা সম্ভব হয়নি।
ফলে কিছু ঋণগ্রহীতা এবং বৃহৎ ঋণ হিসাবের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা ও নির্দেশনা থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরীক্ষকদের ‘এমফ্যাসিস অব ম্যাটার’ অনুচ্ছেদে প্রভিশন সংরক্ষণ, লিজ হিসাবায়ন, কর্মচারী সুবিধা দায় নিরূপণ এবং মূলধন পর্যাপ্ততা সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।























