ঢাকা   বৃহস্পতিবার ১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩

ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারে বেক্সিমকোর বাজারমূলধন কমল ৫,৬৭০ কোটি টাকা

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৩৩, ১৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ

ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারে বেক্সিমকোর বাজারমূলধন কমল ৫,৬৭০ কোটি টাকা

ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর মাত্র সাত কর্মদিবসেই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বেক্সিমকো লিমিটেড প্রায় ৫ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা বাজারমূলধন হারিয়েছে। কোম্পানিটির শেয়ারদরের টানা পতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

বেক্সিমকো গ্রুপের প্রধান এই কোম্পানির শেয়ারদর বুধবার নেমে আসে ৫২ টাকা ৮০ পয়সায়। অথচ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে শেয়ারটির ফ্লোর প্রাইস ছিল ১১০ টাকা ১০ পয়সা। ফলে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর শেয়ারটির দর প্রায় ৪৭ শতাংশ কমে গেছে।

গত ৯ জুন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা পুনরায় চালুর অংশ হিসেবে বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি বড় কোম্পানির শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস তুলে নেয়। এরপর থেকেই বেক্সিমকোর শেয়ারে ধারাবাহিক দরপতন শুরু হয়।

একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও বেক্সিমকোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রায় প্রতিদিনই শেয়ারটি সর্বনিম্ন দরসীমা বা লোয়ার সার্কিট ব্রেকারে অবস্থান করছে। তবে বাজারে উল্লেখযোগ্য ক্রেতার উপস্থিতি না থাকায় বিক্রয়চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

বাজার সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত সাত কার্যদিবসে বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী কোটি কোটি শেয়ার বিক্রির অর্ডার দিলেও লেনদেন হয়েছে মাত্র এক লাখের কিছু বেশি শেয়ার। এতে কোম্পানিটির শেয়ারে তারল্য সংকটের চিত্রও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান কারাবন্দি হওয়ার পর থেকেই গ্রুপটির ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দেয়। এর ফলে কোম্পানিটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রুপটির অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বর্তমানে প্রায় স্থবির অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ঋণখেলাপির কারণে বিভিন্ন ব্যাংক আইনি পদক্ষেপও শুরু করেছে।

এদিকে নিয়ন্ত্রক ও আইনি জটিলতাও বেক্সিমকোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনায় বিএসইসি বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস এবং শাইনপুকুর সিরামিকসে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয়। তবে ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে মামলা করা হয়েছে, যা এখনো বিচারাধীন রয়েছে।

স্বচ্ছতা ও তথ্য প্রকাশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে বেক্সিমকো কোনো আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন বা প্রকাশ করতে পারেনি। সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) ছিল ৩ টাকা ৭৮ পয়সা।

অন্যদিকে, বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পদ রিসিভারের অধীনে নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দায়ের করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বাংলাদেশ ব্যাংককে রিসিভার নিয়োগ এবং গ্রুপটির সম্পদ জব্দের নির্দেশ দেয়। পরে আপিল বিভাগও মূলত ওই আদেশ বহাল রাখে, যদিও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসকে এর বাইরে রাখা হয়।

২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত কোম্পানিটির ৬৬ শতাংশের বেশি শেয়ার সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে কোনো আর্থিক হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ না হওয়া, উল্লেখযোগ্য ডিভিডেন্ড না পাওয়া এবং শেয়ারদরের ধারাবাহিক পতনের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গ্রুপটির পরিচালনাগত স্থবিরতা, ঋণসংক্রান্ত জটিলতা এবং চলমান আইনি বিরোধের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বেক্সিমকোর ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে কোম্পানিটির শেয়ারদরের পতন সামগ্রিক বাজার মূলধনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সর্বশেষ