ঢাকা   শুক্রবার ২০ মার্চ ২০২৬, ৬ চৈত্র ১৪৩২

ইরানি তেলে আংশিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ভাবনায় যুক্তরাষ্ট্র

যুদ্ধের চাপে নীতির ইউ-টার্ন?

বিশেষ প্রতিবেদন

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:২৪, ২০ মার্চ ২০২৬

ইরানি তেলে আংশিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ভাবনায় যুক্তরাষ্ট্র

চলমান ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তৈরি হওয়া অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানের ‘কিছু’ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার চিন্তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক সাক্ষাৎকারে এই ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তিনি জানান, এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়তে পারে, যা দাম নিয়ন্ত্রণে কিছুটা ভূমিকা রাখবে। যুদ্ধের কারণে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে—এ প্রেক্ষাপটেই এমন ভাবনা সামনে এসেছে।

বিবিসি জানিয়েছে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে এটি দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ তেলের দামে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না; বরং ইরানের বর্তমান শাসন ব্যবস্থার তহবিল বাড়াতে সহায়ক হতে পারে, যাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রই যুদ্ধ করছে। মেরিটাইম নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোন কমপ্লায়েন্স সার্ভিসেসের পরিচালক ডেভিড ট্যানেনবাউম বলেন, “এটা একেবারেই অদ্ভুত সিদ্ধান্ত। এতে আমরা ইরানকে তেল বিক্রির সুযোগ দিচ্ছি, যা তাদের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় অর্থ জোগাতে পারে।”

যুদ্ধের আগে ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা ছিল চীন। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞার কারণে চীন কম দামে ইরানি তেল কিনত। তবে নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে ভারত, জাপান ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো ইরানের তেল কিনতে পারবে, ফলে চীনকে বাজারমূল্যে তেল কিনতে বাধ্য করা যেতে পারে বলে মনে করছেন স্কট বেসেন্ট।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে সমুদ্রে থাকা প্রায় ১৪ কোটি ব্যারেল ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০ থেকে ১৪ দিনের জন্য কিছুটা কমতে পারে।

তবে এই পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে বা তেলের বিক্রির অর্থ ইরান সরকারের হাতে যাওয়া ঠেকানো যাবে কি না—সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে সরাসরি কিছু না বললেও জানিয়েছেন, তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী চাহিদার তুলনায় প্রস্তাবিত অতিরিক্ত সরবরাহ খুবই কম, ফলে বাজারে এর প্রভাব সীমিতই থাকবে। পাশাপাশি, ইরানের কিছু তেল ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পথে বাজারে পৌঁছাচ্ছে—নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে ক্রেতা আরও বাড়বে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির বিশেষজ্ঞ র‌্যাচেল জিয়েম্বা বলেন, “এতে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে, তবে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না এবং অনেক প্রশ্নের জন্ম দেবে।”

এর আগে জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব মজুদ থেকে তেল ছাড়ার পাশাপাশি রাশিয়ার তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞাও সাময়িকভাবে শিথিল করেছিল। সেই সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় নেতাদের সমালোচনার মুখে পড়ে, কারণ এতে ভ্লাদিমির পুতিন সরকারের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় এবং ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে মনে করা হয়।

নতুন এই প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইতোমধ্যে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ইরানের তেল খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করার একটি বিল পাস করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে না ইরানের তেল বিক্রির অর্থ সরাসরি সরকারের হাতে যাক, তবে বাস্তবে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে। বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের উদ্বেগ এই উদ্যোগেই স্পষ্ট।

বিশ্বে প্রতিদিন ব্যবহৃত প্রায় ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা ইরানের উপকূলঘেঁষা একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে সংঘাত শুরু হওয়ার পর এই পথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

যদিও কিছু তেল বিকল্প পথে সরানো হচ্ছে, তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক সরবরাহ ইতোমধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।

অন্যদিকে, ইরান ও কাতার পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্রে পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। ফলে সংঘাত শেষ হলেও জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।