ঢাকা   মঙ্গলবার ২৩ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩

কাগজে মুনাফা, বাস্তবে ৩,৩৪০ কোটি টাকার লোকসান? ওয়ান ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষকের গুরুতর সতর্কবার্তা

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:৫৭, ২৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ

কাগজে মুনাফা, বাস্তবে ৩,৩৪০ কোটি টাকার লোকসান? ওয়ান ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষকের গুরুতর সতর্কবার্তা

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের প্রতিষ্ঠান ওয়ান ব্যাংক পিএলসির ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে একাধিক গুরুতর অসঙ্গতি ও ঝুঁকির বিষয় তুলে ধরেছেন নিরীক্ষক। ব্যাংকটির প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী মুনাফা ও ইতিবাচক সম্পদ অবস্থান দেখা গেলেও, প্রয়োজনীয় প্রভিশন স্বীকৃতি দেওয়া হলে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত বলে উল্লেখ করা হয়েছে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।

৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে মাহামুদ সবুজ অ্যান্ড কোং, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের পার্টনার মোদাসসার আহমেদ সিদ্দিক এফসিএ ‘এমফ্যাসিস অব ম্যাটার’ অনুচ্ছেদে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ওয়ান ব্যাংক কর-পরবর্তী ২১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা নিট মুনাফা, ২ হাজার ৩৩৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা শেয়ারহোল্ডারস’ ইকুইটি, শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ০.২০ টাকা এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) ২১.৯২ টাকা দেখিয়েছে।

তবে নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ৩ হাজার ৯০৩ কোটি ৪ লাখ টাকার প্রভিশন স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এই প্রভিশন হিসাবভুক্ত করা হলে ব্যাংকটির ঘোষিত মুনাফা ২১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা থেকে উল্টো ৩ হাজার ৩৪০ কোটি ২১ লাখ টাকার লোকসানে পরিণত হতো।

একই সঙ্গে শেয়ারহোল্ডারস’ ইকুইটি ২ হাজার ৩৩৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা থেকে কমে ঋণাত্মক ১ হাজার ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকায় নেমে আসত। এ হিসাবের মধ্যে ৫৪১ কোটি ১৬ লাখ টাকার ডিফার্ড ট্যাক্স অ্যাসেট সমন্বয়ের প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

নিরীক্ষকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইপিএস ০.২০ টাকার পরিবর্তে ঋণাত্মক ৩১.৩৪ টাকা এবং এনএভি ২১.৯২ টাকার পরিবর্তে ঋণাত্মক ৯.৬২ টাকা হতো।

আর্থিক বিবরণীর ৭.১১ নম্বর টীকায় উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএসডি-১ (উইং-২)/২২০৯/২০২৬-৩১২ নম্বর চিঠির মাধ্যমে ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রদত্ত অনুমোদনের ভিত্তিতে এই ৩ হাজার ৯০৩ কোটি ৪ লাখ টাকার প্রভিশন স্বীকৃতি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।

নিরীক্ষক আরও জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় প্রভিশন স্বীকৃতি দেওয়া হলে ব্যাংকটি ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (সংশোধিত) অনুযায়ী নির্ধারিত ন্যূনতম ৫০০ কোটি টাকার মূলধন সংরক্ষণ শর্তও পূরণ করতে পারত না। ফলে ব্যাংকটির মূলধন আইনগত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যেত।

প্রতিবেদনে ঋণ শ্রেণিকরণ ও সুদ আয়ের হিসাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার নং-১৫ (২৭ নভেম্বর ২০২৪) অনুযায়ী, সাবস্ট্যান্ডার্ড ও ডাউটফুল ঋণের ওপর অর্জিত সুদ আয় হিসেবে দেখানো যায় না; তা ‘ইন্টারেস্ট সাসপেন্স অ্যাকাউন্টে’ স্থানান্তর করতে হয়।

কিন্তু নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ওয়ান ব্যাংক কিছু ঋণকে গুণগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে অশ্রেণিকৃত অবস্থায় রেখেছে, যদিও বাস্তব পরিস্থিতিতে সেগুলো বিরূপ শ্রেণিকরণের যোগ্য ছিল। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ঋণের সুদ আয় হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে, যা বিধি অনুযায়ী স্থগিত থাকার কথা ছিল।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ না করায় এইভাবে আয় হিসেবে স্বীকৃত সুদের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে তাদের ধারণা, এর পরিমাণ কয়েকশ’ কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। ফলে প্রকৃত সুদ আয়, মুনাফা এবং শেয়ারহোল্ডারস’ ইকুইটি ঘোষিত হিসাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম হতে পারে।

এছাড়া মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (Capital to Risk-Weighted Assets Ratio) সম্পর্কেও আপত্তি তুলেছেন নিরীক্ষক। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে ন্যূনতম ১২.৫০ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষে ওয়ান ব্যাংকের একক ভিত্তিতে মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত ছিল ১১.১২ শতাংশ এবং সমন্বিত ভিত্তিতে ছিল ১১.৩৩ শতাংশ, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সীমার নিচে।

সব মিলিয়ে নিরীক্ষকের ‘এমফ্যাসিস অব ম্যাটার’ অনুচ্ছেদে উঠে আসা তথ্যগুলো ওয়ান ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা, প্রভিশন ঘাটতি, ঋণ শ্রেণিকরণ এবং মূলধন সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যদিও নিরীক্ষক তার মতামত (Audit Opinion) অপরিবর্তিত রেখেছেন, তবুও এসব বিষয়ে বিনিয়োগকারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের বিশেষ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

সর্বশেষ