Runner Automobiles
Runner Automobiles
Share Business Logo
bangla fonts
facebook twitter google plus rss

নারী, তুমি কি আসলেও দুর্বোধ্য?


০৯ নভেম্বর ২০১৭ বৃহস্পতিবার, ০১:২৯  পিএম

শেয়ার বিজনেস24.কম


নারী, তুমি কি আসলেও দুর্বোধ্য?

"নারীর মন সৃষ্টি কর্তা নিজেও ঠিক মত বুঝেন কিনা সন্দেহ আছে”।

এই কথাটা জীবনে কত জায়গায় যে পেয়েছি! পড়েছি এবং শুনেছি। এই কথায় কি নারীকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হলো নাকি হেয় করা হলো সেটা একটা ভাল প্রশ্ন হতে পারে। অনেকেই ঠাট্টার ভংগীতে বলেন, নারী সৃষ্টি করে সৃষ্টিকর্তা নিজেই নাকি বেকুব হয়ে গেছিলেন`......। তাই কি?

এই কথাটা একজন পূরুষের মন্তব্য থেকেই এসেছে, তাতে কোনই সন্দেহ নাই। তিনি একজন ব্যর্থ পুরুষ যিনি তার প্রেমিকা বা স্ত্রীকে খুশী করতে পারেন নাই। তিনি সম্ভবত বিধাতাকে একজন পুরুষ হিসাবে চিন্তা করেছিলেন,নিজেকে নিখুঁত একজন মানুষ ধারণা করেছিলেন, এবং তার নিজের ব্যর্থতায় বিধাতাকে সংগী করে নিয়েছিলেন। নারীর ব্যাপারে উক্তির জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে যদি বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগীতা হয় তাহলে এই উক্তিটা প্রথম শ্রেনীতে প্রথম স্থান অধিকার করবে। অনেক নারীকে অবশ্য এই উক্তিতে খুশী হতে, গর্বিত হতে দেখি। আর নারী হিসাবে আমি অনুভব করেছি, সুচতুরভাবে ঠকানো হচ্ছে নারীদেরকে। আর সমাজ সেখানে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে চলেছে।

কোন কিছু দুর্বোধ্য হয় তখনই যখন সে ব্যাপারে কারো জ্ঞান কম থাকে। উওম্যান সাইকোলজী যে জ্ঞান এর একটা বিষয় হতে পারে এটা পুরুষরা কখনও ভাবতেই পারে না। পুরুষদের মন কি নারীরা সম্পুর্ন বুঝে ফেলছে? কখনোই না। তাহলে পুরুষদের ব্যাপারে একই ধরনের উক্তি বাজারে নাই কেন? কারন নারীদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পুরুষদের সুযোগের অনেক পরে এসেছে। নারীরা জেনে এসেছে তাদেরকে পুরুষদের কথা মেনে চলতে হবে। পুরুষরা যা ভাবে তাই বেদবাক্য। “নারী, তুমি তো নির্বোধ, জ্ঞান নাই তোমার”- এই কথা শুনতে শুনতে নারীদের মনে বিশ্বাসের জায়গা করে নিয়েছে। অনেক শিক্ষিত নারীপুরুষ এখনও এই ভাবনার অধিকারী।

পুরুষরা নারীদের মন বুঝার চেষ্টা করতে চায় না, করার সেই মানসিকতা এবং ধৈর্য্য নাই। মাথায় তারা চাপ নিবে কোন গুরুত্বপূর্ন বিষয়ে। নারীর মন বুঝা কি কোন গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার হলো? তারা ধরেই নেয় যে নারীরা তাদের প্রতি খুশী থাকবে। এটা নারীদের দায়িত্ব। পুরুষদের ইহজাগতিক সকল ধরণের শারীরিক চাহিদার পূর্ণ খেয়াল রাখবে নারী। নারী তাতেই ব্যস্ত থাকবে। মন নিয়ে ভাবাভাবি আবার কি? পুরুষ খুশী না থাকলে তো নারীর বিরাট ঝুঁকি। পুরুষকে হারানোর ঝুঁকি, আর্থিক নিরাপত্তা হারানোর ঝুঁকি, সামাজিক সম্মান ও নিরাপত্তা হারানোর ঝুঁকি। এবং সর্বোপরি, পরকালের ঝুঁকি।

একটা বহু প্রচলিত এবং বহু ব্যবহৃত ধারনা আছে যে নারীর মন খুশী করা যায় কেবল অর্থ সম্পদ দিয়ে। তাহলে দাড়ালো যে অর্থ সম্পদের প্রতি পুরুষের কোন মোহ নেই। বিশ্বব্যাপী অর্থ সম্পদ পরিচালনা এবং তা নিয়ে দুর্নীতি কারা করে চলেছে? রাজনীতি আর ক্ষমতার লড়াই এ অর্থশালী হওয়ার প্রতিযোগীতায় কারা আছে? বৈশ্বিক আর্থিক সমাজ কারা নিয়ন্ত্রণ করছে? শুধুমাত্র অর্থ, সম্পদ দখলের জন্য যুগে যুগে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত কারা নিয়েছে?

অর্থ সম্পদের মধ্যে বেশী গুরুত্ব বহন করে সোনা,রূপা বা হীরার অলঙ্কার। এগুলি সৌন্দর্য বৃদ্ধিকারক, স্থায়ী সম্পদ এবং সমাজের কাছে দৃষ্টিগোচর করা যায় খুব সহজে। একটা সময় ছিল যখন অলঙ্কার শুধু নারীদের ভূষন ছিল না। পুরুষরা সমান তালে অলঙ্কার পড়তো। পুরুষদের গহনার কারন ছিল পদাধিকার এর বহিঃপ্রকাশ। সেটা জঙ্গল সমাজের গোত্র প্রধান থেকে শুরু করে রাজা বাদশাহ দের সময় পর্যন্ত দেখা গেছে। যত মুল্যবান অলঙ্কার, তার মানে সে তত শক্তিশালী এবং ক্ষমতাবান। আজকাল আবার পুরুষরা অলঙ্কারের দিকে ঝুকে পড়েছে।

ছোটবেলা থেকে শুনেছি বিবাহিত নারীদের কিছু বিশেষ গহনা পড়তে হয়। ধর্মভেদে তার পার্থক্য হয়, স্থানভেদেও হয়। শুনেছি হাতে চুড়ি না পড়লে স্বামীর অমঙ্গল হবে। আবার কোথাও নাকফুল, কোথাও মঙ্গলসূত্র। পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে বিবাহিত নারীদের হাতে আংটি গুরুত্বপুর্ন। পুরুষদের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য। সবই একটা চিহ্ন,অনেকটা দ্রব্যের ব্র্যান্ডের মত। চিহ্নগুলি বলছে, আমি বিবাহিত।
নারীদের অলঙ্কার, সম্পদ দিয়ে খুশী করার প্রচলন পুরুষরাই করেছে। নারীদের জীবনে নিরাপত্তা হিসাবে কাজ করেছে অর্থ সম্পদ। কারন পুরুষরা সঙ্গী হিসাবে তাদের জীবনে কতটুকু বিশ্বস্ত সংগী হিসাবে থাকবে তার কোন নিশ্চয়তা নাই। পুরুষের অবর্তমানে একা নিজের জীবনের দায়িত্ব নিবে সেই অবস্থানও নারীদের ছিল না, এখনও অনেকের নাই। অলঙ্কার, সম্পদ শুধু নারীতে নারীতে প্রতিদ্বন্ধীতা নয়, এটা পুরুষে পুরুষেও প্রতিদ্বন্ধীতা। যার স্ত্রীর যত বেশী অলঙ্কার সম্পদ থাকবে তার পুরো কৃতিত্ব পায় স্বামী। যে স্ত্রী যত বেশী মূল্যবান সম্পদের মালিক,সেই স্বামীও তত বেশী মূল্যবান। কোন কোন সম্প্রদায়ে বিয়ের সময় নারীকে নিরাপত্তা অর্থের চুক্তি দেয়া হয়। এই ধরণের ব্যবস্থায় ধরেই নেয়া হয় যে এই নারী কখনও আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে না। এই নিরাপত্তা অর্থ আসলে সারা জীবনের জন্য কতটুকু নিরাপত্তা দিতে পারে সেটি আরেকটি জটিল প্রশ্ন।

নারীদের অলঙ্কারের প্রতি অতি-আকর্ষন এসেছে তার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার মানসিকতা এবং সামাজিক অহংকারের জায়গা থেকে। অনেক নারী এই ব্যবহারের চক্রে পুরুষকেও তাদের প্রয়োজনের খোরাক হিসাবে দেখতে শিখেছে। এই প্রয়োজন মূলত এসেছে নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকে। কোন নারীর আর্থিক নিরাপত্তার প্রয়োজন না থাকলেও সেখানে থাকে সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়, পারিবারিক সম্মানের বিষয়। নারীদের এই হারানোর ভয় থেকেই পুরুষরা পায় নারীকে নিশ্চিতভাবে পাওয়ার নিশ্চয়তা। তাই মনের চর্চা করার তাগিদ সেইভাবে তৈরী হয়নি। নারীদের এই নিরাপত্তাহীনতার বোধ কোথা থেকে এসেছে সেটা ভাবা খুব প্রয়োজন। এই নিরাপত্তার বিনিময়মূল্য কি সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার।

এরপর যোগ হয়েছে ব্যবসা জগত। নারীরা যদি সোনা হীরা বর্জন করে তাহলে পৃথিবীর বিরাট এক ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্থ হবে, আর থেমে যাবে এই ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অনেক মানুষের মুনাফা লাভ। খনিজ সম্পদ থেকে এই মুনাফা লাভের চক্রে বিভিন্ন দেশ হয় সম্পদশুন্য আর প্রান হারায় অনেক মানুষ।

নারী, তুমি এবার অন্তরের চোখ মেলো। বস্তুজগতে পুরুষের পরীক্ষা না নিয়ে তার জন্য তৈরী কর নতুন প্রশ্নপত্র। এই পরীক্ষায় পাশ করতে হলে তাকে জানতে হবে তোমার মনের দেশ, মহাদেশ এবং তাদের অলিগলি । জ্ঞানে সমৃদ্ধ কর তোমার নিজের মন। বিধাতাও তোমার মন বুঝতে পারে না এই অজুহাত দেয়ার আগে তাকে জানাও, এই পৃথিবীর বুকেই আছে নারীর মন পড়ার জন্য বিভিন্ন পুস্তক আর আছে আশেপাশের জীবনের গল্প। তোমাকে জানার ইচ্ছা তার মধ্যে আসতে হবে। ফাঁকিবাজী কথা দিয়ে আর না চলুক। অলঙ্কার, বিষয়সম্পত্তি দিয়ে আর ঢাকতে দিও না তাদের ব্যর্থতা, তাদের উদাসীনতা, তাদের অবহেলা, তাদের অজ্ঞতাকে। দেখবে কত পুরুষ অকৃতকার্য হচ্ছে সেই পরীক্ষায়। অলংকারের আবরনে আর ঢাকতে দিও না তোমার মনের ঐশ্বর্যকে। মনের দাম মিললে বাকি সব কিছুতেই থাকবে শান্তি চুক্তি। শিক্ষিত সমাজের নারীদের এই ব্যাপারে দায়িত্ব বেশী। তাদেরকেই এটা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সর্বপ্রথম। তাহলে সেটা একদিন পরিনত হবে সামাজিক আচারে।

“"নারীর মন সৃষ্টি কর্তা নিজেও ঠিক মত বুঝেন কিনা সন্দেহ আছে”- এই উক্তির অবসান হোক। নারী-পুরুষের সম্পর্কে উভয়েরই মনের চর্চা বাড়ুক। আত্মিক সম্পর্কের প্রাধান্য বৃদ্ধি পাক।

 

 

 

শেয়ারবিজনেস24.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: