দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ডিভিডেন্ড নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার। বিনিয়োগকারীদের হাতে আরও বেশি নগদ লভ্যাংশ পৌঁছে দিতে এবং কোম্পানিগুলোকে শেয়ারহোল্ডারবান্ধব করতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে নতুন করনীতি চালুর প্রস্তাব আসছে।
প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি কর-পরবর্তী নিট মুনাফার ৩০ শতাংশের কম ডিভিডেন্ড বিতরণ করলে ঘাটতি অংশের ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর দিতে হবে। একই সঙ্গে ক্যাশ ডিভিডেন্ডের তুলনায় বেশি স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করা হলে বা শুধুমাত্র স্টক ডিভিডেন্ড দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ করের আওতায় আনা হবে।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হতে যাওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আয়কর আইনের সংশোধনীর মাধ্যমে এ বিধান অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে ব্যাংক, বিমা, লিজিং ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এই নতুন করব্যবস্থার বাইরে রাখা হচ্ছে।
কীভাবে কার্যকর হবে নতুন কর?
ধরা যাক, কোনো কোম্পানির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ১০০ কোটি টাকা। নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটিকে কমপক্ষে ৩০ কোটি টাকা ডিভিডেন্ড দিতে হবে। কিন্তু যদি তারা মাত্র ২০ কোটি টাকা লভ্যাংশ ঘোষণা করে, তাহলে বাকি ১০ কোটি টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর দিতে হবে।
অর্থাৎ, সরকার এখন মুনাফা সংরক্ষণের পরিবর্তে ডিভিডেন্ড বিতরণের হারকে করনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে যাচ্ছে।
কেন এই পরিবর্তন?
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অনেক কোম্পানি বছরের পর বছর ভালো মুনাফা করলেও শেয়ারহোল্ডারদের তুলনামূলক কম ডিভিডেন্ড দেয়। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশিত রিটার্ন থেকে বঞ্চিত হন। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে কোম্পানিগুলোকে আরও বেশি লভ্যাংশ দিতে উৎসাহিত করবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এ উদ্যোগের ফলে—
• কম ডিভিডেন্ড দেওয়া কোম্পানির সংখ্যা কমতে পারে
• ক্যাশ ডিভিডেন্ড প্রদানের প্রবণতা বাড়তে পারে
• অতিরিক্ত স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণার সংস্কৃতি নিরুৎসাহিত হবে
• শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা শক্তিশালী হতে পারে
বিতর্কও রয়েছে
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলামের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে কোনো কোম্পানিকে নির্দিষ্ট হারে ডিভিডেন্ড দিতে বাধ্য করা আদর্শ পদ্ধতি নয়। কারণ দ্রুত সম্প্রসারণশীল ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা সম্প্রসারণে মুনাফার বড় অংশ পুনর্বিনিয়োগ করে থাকে।
তবে তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় অধিকাংশ বিনিয়োগকারী ডিভিডেন্ডকে বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান সূচক হিসেবে দেখেন। তাই দীর্ঘদিন ধরে কম ডিভিডেন্ড দেওয়া কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের প্রস্তাব বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে?
যদি প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পায়, তাহলে এটি হবে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ডিভিডেন্ড নীতিতে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় পরিবর্তন। এতে মুনাফা ধরে রাখার পরিবর্তে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে লভ্যাংশ বিতরণের প্রবণতা বাড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক বার্তা দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।






















