দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা জোরদার করতে নতুন দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)। এতদিন তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের বিতরণ, হস্তান্তর ও নিষ্পত্তি কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এবার প্রতিষ্ঠানটি মিউচুয়াল ফান্ডের কাস্টডিয়ান হিসেবে কাজ করার প্রস্তুতি নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রয়োজনীয় লাইসেন্স পেতে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আবেদন জমা দেবে সিডিবিএল। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ইতোমধ্যে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে।
বিএসইসির ইতিবাচক সাড়া
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) উদ্যোগটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। সম্প্রতি কমিশনের সঙ্গে এক বৈঠকে সিডিবিএলকে কাস্টডিয়ান লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে উৎসাহ দেওয়া হয়।
সিডিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল মোতালেব জানান, “মিউচুয়াল ফান্ডের কাস্টডিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ আমাদের প্রস্তুত রয়েছে।”
ইউএফএস কেলেঙ্কারির পর বাড়ছে কাস্টডিয়ানের গুরুত্ব
এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে নেওয়া হচ্ছে, যখন কাস্টডিয়ানদের ভূমিকা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে বাজারে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষ করে ইউনিভার্সাল ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশন (ইউএফএস) পরিচালিত তিনটি ওপেন-এন্ডেড মিউচুয়াল ফান্ড থেকে প্রায় ২০৭ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা কাস্টডিয়ান ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনে দেয়।
২০২২ সালের অক্টোবরে ইউএফএসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ হামজা আলমগীর অর্থ নিয়ে দুবাইয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তৎকালীন কাস্টডিয়ান ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-র ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে সিডিবিএলের মতো প্রযুক্তিনির্ভর ও কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাস্টডিয়ান হিসেবে যুক্ত হওয়াকে বাজার সংশ্লিষ্টরা ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন।
আয় কমেছে, বিকল্প খাতে নজর সিডিবিএলের
দীর্ঘদিনের শেয়ারবাজার মন্দাভাব সিডিবিএলের আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের প্রতি এক লাখ টাকা নিষ্পত্তিতে সিডিবিএল পায় মাত্র ২৫ টাকা ফি। ফলে দৈনিক লেনদেন কমলে আয়ও কমে যায়।
এ ছাড়া বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার) হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফি ১০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ টাকা করায় আয়ের ওপর আরও চাপ পড়ে।
২০২৫ অর্থবছরে বিও হিসাব থেকে আয় নেমে আসে ৭ কোটি টাকা,
আগের বছর যা ছিল ১৩ কোটির বেশি।
এর প্রভাবে একই অর্থবছরে সিডিবিএলের পরিচালন মুনাফা ১৭ শতাংশের বেশি কমে দাঁড়ায় ৫২ কোটি ২০ লাখ টাকা। নতুন আয়ের উৎস তৈরির লক্ষ্যেই মিউচুয়াল ফান্ডের কাস্টডিয়ান হিসেবে কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশোধিত বিধিমালায় কাস্টডিয়ানের বাড়তি ক্ষমতা
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, এখন কাস্টডিয়ানদের দায়িত্ব শুধু ফান্ডের সম্পদ সংরক্ষণেই সীমাবদ্ধ নয়।
নতুন করে যুক্ত হয়েছে—
ইউনিটহোল্ডারদের হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ
ব্যাংক লেনদেন ও নগদ প্রবাহ তদারকি
আগে এসব নিয়ন্ত্রণ ছিল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির হাতে। গত বছরের নভেম্বরে কার্যকর হওয়া সংশোধিত বিধিমালায় কাস্টডিয়ানদের ক্ষমতা ও দায়বদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।
সিডিবিএলের পটভূমি
২০০০ সালের আগস্টে প্রতিষ্ঠিত সিডিবিএল দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক,
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই),
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)
এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-র সহযোগিতায় গঠিত হয়।
মিউচুয়াল ফান্ড খাত: বর্তমান চিত্র
বর্তমানে দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতে—
মোট সম্পদ ব্যবস্থাপনা: ১১,৩৪৩ কোটি টাকা
অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি: ৬৮টি
মিউচুয়াল ফান্ড: ১৩৬টি
ট্রাস্টি: ৯ জন
কাস্টডিয়ান: ৯ জন
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সিডিবিএল কাস্টডিয়ান হিসেবে যুক্ত হলে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নতুন মাত্রা পেতে পারে—যা দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট কাটাতে সহায়ক হবে।
























